নিজস্ব সংবাদদাতা: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই সাধারণ মানুষের নজর এখন নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেদিকে। ভোটের আগে বিজেপির প্রকাশিত ইস্তেহার ‘ভরসার শপথ’-এ রাজ্যবাসীর কাছে একাধিক বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সরকার গঠনের কয়েক দিনের মধ্যেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও অধিকাংশ প্রকল্প এখনও পরিকল্পনা ও প্রাথমিক প্রশাসনিক স্তরেই রয়েছে।
নতুন সরকারের কাজের অগ্রগতি তুলে ধরতে ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে একটি অনলাইন রিয়েল-টাইম ট্র্যাকার। ‘BJP Sarkar Promises’ নামে এই ট্র্যাকারে নির্বাচনী প্রচারে দেওয়া মোট ১৪০টি প্রতিশ্রুতির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তার মধ্যে ১১টি প্রতিশ্রুতিকে বর্তমানে “চলমান” বা “প্রক্রিয়াধীন” হিসেবে দেখানো হচ্ছে। পাশাপাশি বাকি প্রতিশ্রুতিগুলি পূরণের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমার কাউন্টডাউনও রাখা হয়েছে, যা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশ রোধে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে বিএসএফ-কে জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকার সূত্রে দাবি, আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে এই প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে। নির্বাচনী প্রচারে শুভেন্দু অধিকারী একাধিকবার অভিযোগ করেছিলেন যে সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশ ও গবাদি পশু পাচারের কারণে রাজ্যের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই কারণেই সরকার এই ইস্যুকে প্রথম সারির অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে।
‘কাট মানি’ ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও কড়া অবস্থান নেওয়ার বার্তা দিয়েছে নতুন সরকার। বিজেপির অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ সরকারি পরিষেবা পেতে দুর্নীতি ও কাটমানির শিকার হয়েছেন। সেই পরিস্থিতি বদলাতে প্রশাসনিক স্তরে নজরদারি বাড়ানো, অভিযোগ গ্রহণের পৃথক ব্যবস্থা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘হোয়াইট পেপার’ প্রকাশের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে সূত্রের খবর। যদিও এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও রিপোর্ট প্রকাশ হয়নি।
মহিলাদের জন্য ঘোষিত আর্থিক সহায়তা প্রকল্প ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ নিয়েও জোর চর্চা শুরু হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মহিলাদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল বিজেপি। প্রশাসনিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, জুন মাস থেকেই প্রকল্পটি চালুর লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্য সরকারি বাসে মহিলাদের বিনামূল্যে যাত্রার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেয়েছে। নারী নিরাপত্তা বাড়াতে ‘দুর্গা সুরক্ষা স্কোয়াড’, পৃথক নারী পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং সরকারি চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের বিষয়েও আলোচনা চলছে।
সরকারি কর্মীদের বহুদিনের দাবি DA ও সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর করার বিষয়েও ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক বৈঠক শুরু হয়েছে। নির্বাচনের আগে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সমস্ত বকেয়া DA পরিশোধ এবং সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ দ্রুত কার্যকর করা হবে। যদিও এখনও পর্যন্ত অর্থ বরাদ্দ বা সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশ হয়নি, তবুও কর্মচারী মহলের একাংশ আশাবাদী যে ধাপে ধাপে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে নতুন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শপথ নেওয়ার পরই রাজ্যে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালুর অনুমোদন দেন। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গে AIIMS, IIT, IIM এবং ক্যানসার হাসপাতাল গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও সামনে আনা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরবঙ্গের মানুষ উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। যদিও এখনও পর্যন্ত প্রকল্পগুলির কাজ শুরু হয়নি, তবে সরকার দাবি করছে কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
চাকরি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বড়সড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান, শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বেকার যুবকদের মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। আপাতত প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা বাতিলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত চাকরিপ্রার্থীদের জন্য সরকারি চাকরির পরীক্ষায় পাঁচ বছরের বয়সসীমা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মূল কর্মসংস্থান প্রকল্পের রূপরেখা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রেও একাধিক পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে নতুন সরকার। ধান, আলু ও আমচাষিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, মৎস্যজীবীদের কেন্দ্রীয় প্রকল্পের আওতায় আনা, দার্জিলিং চায়ের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং এবং বন্ধ পাটকল পুনরুজ্জীবনের মতো প্রতিশ্রুতিগুলিও এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
এছাড়া Uniform Civil Code (UCC) বাস্তবায়ন, গরু পাচার রোধে কড়া আইন, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং “বন্দে মাতরম মিউজিয়াম” তৈরির মতো রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিশ্রুতিও বিজেপির ইস্তেহারে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। যদিও এই বিষয়গুলিতে এখনও প্রশাসনিক স্তরে আলোচনা চলছে।
এদিকে বিধানসভায় শপথ নেওয়ার সময় শুভেন্দু অধিকারীর আচরণও রাজনৈতিক মহলে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর— দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হওয়ার পর তিনি ভবানীপুর কেন্দ্রের বিধায়ক হিসেবে শপথ নেন। বিধানসভায় প্রবেশের আগে তাঁকে গার্ড অফ অনার দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। সম্মানের নিদর্শন হিসেবে তিনি বিধানসভার সিঁড়িতে মাথা নত করেন, যা বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, সরকার গঠনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই একাধিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হলেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলির প্রকৃত মূল্যায়ন হবে আগামী কয়েক মাসের প্রশাসনিক কাজ ও বাস্তব অগ্রগতির ভিত্তিতে। এখন দেখার, ‘ভরসার শপথ’-এর প্রতিশ্রুতিগুলি বাস্তবায়নে শুভেন্দু সরকার কত দ্রুত মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে।

Recent Comments