একমাত্র ছেলেকে হারানোর শোক আজও কাটিয়ে উঠতে পারেননি বৃদ্ধ দম্পতি। কিন্তু সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে তাঁরা এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা ভবিষ্যতে অসংখ্য ছাত্রীর উপকারে আসবে। প্রয়াত ছেলে রাজর্ষি ভট্টাচার্যের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে তিন কাঠারও বেশি জমি দান করেছেন তাঁর বাবা-মা। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পূর্ব কলকাতার হাতিয়ারায় ওই জমিতেই নির্মিত হবে একটি গার্লস হস্টেল।
রাজর্ষি ভট্টাচার্য ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের মেধাবী ছাত্র। ছোটবেলা থেকেই গবেষণার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বিভিন্ন নামী প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেলেও তিনি নিজের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কেই বেছে নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (আইআইএসসি)-এ গবেষণার সুযোগ পান। তাঁর লক্ষ্য ছিল স্বল্প খরচে ওষুধ তৈরির গবেষণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের উপকার করা।
কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আচমকা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। গবেষণার কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পরই কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে প্রাণ হারান রাজর্ষি। ছেলের অকালমৃত্যুর সেই বেদনা আজও বহন করে চলেছেন তাঁর বাবা-মা।
রাজর্ষির বাবা, আয়কর দফতরের অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক, জানান— ছেলের স্মৃতিকে শুধু পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি তাঁরা। বরং এমন কিছু করতে চেয়েছেন, যা সমাজের কাজে লাগবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপকারে আসবে। সেই ভাবনা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়কে জমি দানের সিদ্ধান্ত।
জানা গিয়েছে, জমিটি মূলত রাজর্ষির কাকা দীপক ভট্টাচার্যের ছিল। তাঁরও ইচ্ছা ছিল, ভবিষ্যতে এই জমিতে রাজর্ষি গবেষণার কাজ করবে। কিন্তু কাকার মৃত্যুর পর এবং রাজর্ষির অকালপ্রয়াণে সেই স্বপ্ন আর বাস্তবায়িত হয়নি। তাই পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়, জমিটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করা হবে, যাতে সেখানে ছাত্রীনিবাস তৈরি করে বহু শিক্ষার্থীর উপকার করা যায়।
গত কয়েক মাস ধরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলার পর সম্প্রতি জমির রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই জমিতেই আধুনিক ছাত্রীনিবাস গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি দাতাদের ইচ্ছা অনুযায়ী, প্রয়াত দীপক ভট্টাচার্য ও রাজর্ষি ভট্টাচার্যের স্মৃতির সঙ্গে এই প্রকল্পের নাম যুক্ত রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, সন্তান হারানোর শোকের কোনও সান্ত্বনা হয় না। তবু সেই গভীর বেদনার মধ্যেও সমাজের কল্যাণে এমন উদ্যোগ সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। তাঁর মতে, এই দান শুধু একটি জমি নয়, মানবিকতার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
রাজর্ষির বাবা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, তাঁদের ছেলে আজ আর পাশে নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ ও স্বপ্ন এই ছাত্রীনিবাসের মাধ্যমে বেঁচে থাকবে। ভবিষ্যতে অসংখ্য ছাত্রী সেখানে থেকে পড়াশোনা করবে— এটাই তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এবং ছেলের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।


Recent Comments