চোর বাগানের দুর্গাপুজো মণ্ডপে পদপিষ্টের ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যুর পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ঘটনার জন্য অস্থায়ী হোমগার্ডদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি কলকাতার বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে নিরাপত্তার খামতি খতিয়ে দেখতে বিশেষ দল গঠনের কথা জানিয়েছেন তিনি। মণ্ডপে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশ ও বেরোনোর পথ এবং অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় কোনও ত্রুটি থাকলে দ্রুত পদক্ষেপ করা হবে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
চোরবাগানের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ উঠলেও মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জেনেছেন, পুলিশ তাঁদের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিল। তাঁর দাবি, ঘটনার সময় উদ্ধারকাজে পুলিশ সাহায্য করেছে। তবে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে মণ্ডপের প্রবেশ ও বেরোনোর পথ একই জায়গায় ছিল বলে তাঁর মনে হয়েছে। বৃষ্টির সময় অস্থায়ী হোমগার্ডরা দড়ি সরিয়ে চলে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। গত কয়েক বছর ধরে পুজোর দায়িত্বে থাকা অস্থায়ী হোমগার্ডদের সম্পূর্ণ তালিকাও চেয়ে পাঠিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
চোরবাগানের বিপর্যয়ের ঘটনায় রাতভর জিজ্ঞাসাবাদের পর রবিবার সকালে সাত জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে পুজো কমিটির কয়েক জন কর্তা এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও ভিআইপি পাস সামলানোর দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা রয়েছেন। একটি বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার দুই কর্মীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনার পর পুজো উদ্যোক্তাদের দায়িত্ব এবং পুলিশের নজরদারি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
রবিবার ভবানী ভবনে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী জানান, কলকাতার বিভিন্ন পুজোমণ্ডপের নিরাপত্তা খতিয়ে দেখতে বিশেষ দল কাজ করবে। বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের প্রিন্সিপাল সচিব, দমকলের ডিজি এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের নেতৃত্বে এই দল মণ্ডপে মণ্ডপে পরিদর্শন করবে। কোথাও নিরাপত্তার ঘাটতি নজরে এলে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় ডিসি এবং স্থানীয় থানার ওসি-কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী মণ্ডপে দাঁড়িয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ভিড় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভিআইপি লাইনের ব্যবস্থাও থাকবে না বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কোথায় গাফিলতি ছিল, তা খুঁজে বের করতে পৃথক তথ্য অনুসন্ধানকারী দল গঠনের পরিকল্পনাও জানিয়েছেন তিনি। যে পুরসভা, পুলিশ ও দমকলের তরফে পুজোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তাদের ওই অনুসন্ধানকারী দলের বাইরে রাখার কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, কর্তব্যরত বিচারপতির নেতৃত্বে এই দল গঠন করা হোক। সেই উদ্দেশ্যে কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। বিচারপতি পাওয়া না গেলে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বেও তদন্ত করা হতে পারে। দলে স্বরাষ্ট্র দফতরের যুগ্মসচিব পদমর্যাদার আধিকারিক, পুলিশের এডিজি এবং বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের প্রিন্সিপাল সচিবকে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কথাও ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। ২০ ও ২১ অক্টোবর মৃতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে আর্থিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। পরিবারপিছু ২৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া থেকে শুরু করে শেষকৃত্য পর্যন্ত প্রশাসনিক আধিকারিকেরা পাশে থাকবেন বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শোকের কারণে পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হবে।
এ ছাড়া, চোরবাগানের ঘটনায় আহত ২৫ জনকে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। আগামী ২৬ অক্টোবর মিলন মেলায় আড়ম্বরহীন বিজয়া সম্মিলনীর আয়োজন করা হবে। সেখানে কলকাতা-সহ পাঁচটি পুলিশ কমিশনারেটের পুজো উদ্যোক্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। ওই অনুষ্ঠানেই আহতদের হাতে ৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য তুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এদিকে, চোরবাগানের পুজো কমিটির সঙ্গে রাজনৈতিক যোগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্যে আসা পুজোর পোস্টারে মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো দেবদীপ অধিকারীর নাম রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ওই পুজো কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে জোড়াসাঁকোর বিজেপি বিধায়ক বিজয় ওঝার নামও উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপির সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষের যোগ থাকার কথাও সামনে এসেছে। তবে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশের তরফে স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে।
চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনার পর এখন প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পুজোমণ্ডপগুলিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় এড়ানো। বিশেষ দলগুলির পরিদর্শন ও প্রস্তাবিত তথ্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে ঘটনার দায় নির্ধারণ এবং নিরাপত্তার ঘাটতি চিহ্নিত করা কতটা সম্ভব হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।


Recent Comments