
ফিচার:তপোব্রত ঘোষ
ছবি:নিজস্ব
কলকাতার ফুসফুস রবীন্দ্র সরোবরের নীল জলরাশি আর সবুজের সমারোহে প্রতিবছরই শীতের শুরুতে একদল ডানার মেলা বসে। সুদূর সাইবেরিয়া বা মেরু অঞ্চলের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা থেকে বাঁচতে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এই শহরে ঠাঁই নেয় পরিযায়ী পাখিরা। কিন্তু এবারের চিত্রটা একটু অন্যরকম। প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দে কোথাও যেন একটা তাল কেটেছে।
সৌন্দর্যায়ন না কি উচ্ছেদ?
পরিবেশবিদদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। অভিযোগ উঠেছে, সরোবর চত্বরে ‘সৌন্দর্যায়নের’ নামে যেভাবে নির্বিচারে ঝোপঝাড় ও গাছপালা ছাঁটাই করা হয়েছে, তাতে পাখিরা তাদের স্বাভাবিক আশ্রয় হারিয়েছে। পাখিদের কাছে সৌন্দর্যের চেয়েও বড় হলো নিরাপত্তা এবং খাদ্যের জোগান। ঘন ঝোপঝাড় ছিল তাদের লুকানোর জায়গা, যা এখন অনেকটাই ফাঁকা।
মানুষের কোলাহল ও বিপন্ন স্বাধীনতা
রবীন্দ্র সরোবর শুধু পাখিদের নয়, শহরবাসীর প্রাতঃভ্রমণ ও আড্ডারও প্রিয় জায়গা। তবে সমস্যা দেখা দিয়েছে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত আনাগোনায়।
অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপ:
প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং উচ্চস্বরে শব্দ পাখিদের মনে ভীতির সৃষ্টি করছে।
নিরাপদ দূরত্বের অভাব:
অনেক সময় ছবি তোলার নেশায় বা কৌতূহলী হয়ে মানুষ পাখিদের খুব কাছে চলে যাচ্ছেন, যা তাদের স্বাভাবিক বিচরণে বাধা সৃষ্টি করছে।
পরিসংখ্যানের বিচারে উদ্বেগের ছায়া
বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এক হতাশাজনক চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২০ সাল বা তার আগের বছরগুলোতে যেখানে সরোবরের আকাশে ডানা ঝাপটানোর শব্দে কান পাতা দায় হতো, সেখানে আজ ভিড় অনেকটাই পাতলা। উত্তরের হিমেল হাওয়া এলেও, অনেক পরিচিত অতিথি এবার আর ফেরেনি।
তবুও আশার আলো:
নতুন অতিথিদের মেলা
এতসব নেতিবাচক খবরের মাঝেও কিছু প্রাপ্তি বার্ড-ওয়াচার এবং ফটোগ্রাফারদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।
নতুন অতিথির আগমন:
এবার সরোবরে দেখা মিলেছে বিভিন্ন প্রজাতির ফিঙে এবং কোকিলের।
বিরল মুহূর্ত:
অভিজ্ঞ ফটোগ্রাফারদের লেন্সে ধরা পড়েছে তাদের জলকেলি ও শিকার ধরার বিরল মুহূর্তগুলো। এই ছোট ছোট প্রাপ্তিগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতি এখনো পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নেয়নি।
আমাদের দায়িত্ব: আগামীর নিদান
পরিবেশবিদদের মতে, পাখিদের এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব যদি আমরা সাধারণ মানুষ কিছুটা সংবেদনশীল হই। তাদের দেওয়া
নিদানগুলো হলো:শান্তির পরিবেশ বজায় রাখা:
সরোবর চত্বরে অহেতুক চিৎকার বা উচ্চশব্দ পরিহার করা।
নিরাপদ দূরত্ব:
পাখিদের উত্ত্যক্ত না করে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে তাদের পর্যবেক্ষণ করা।
প্রাকৃতিক ভারসাম্য:
সৌন্দর্যায়নের নামে ঝোপঝাড় না কেটে পাখিদের উপযোগী ‘ইকো-সিস্টেম’ বজায় রাখা।
পরিযায়ী পাখিরা আমাদের শহরের সাময়িক অতিথি নয়, তারা আমাদের পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা যদি দায়িত্বশীল হই, তবে আগামী মরসুমে রবীন্দ্র সরোবরের আকাশ আবারও হাজারো ডানার কলতানে মুখর হয়ে উঠবে। সেই ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকবে তিলোত্তমা।

