ভারত ও আমেরিকার মধ্যে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত সাম্প্রতিক ‘অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তি’ (Interim Trade Deal) আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হলেও, এর গভীর বিশ্লেষণে ভারতের স্বার্থের ক্ষেত্রে বেশ কিছু উদ্বেগের জায়গা ফুটে উঠেছে। সমালোচকদের মতে, এই চুক্তিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কাছে ভারতের একপ্রকার ‘কৌশলগত আত্মসমর্পণ’ ঘটেছে।
ভারসাম্যহীন শুল্ক কাঠামো
চুক্তির অন্যতম প্রধান সমালোচনার জায়গা হলো শুল্কের বৈষম্য। ভারত মার্কিন শিল্পপণ্যের ওপর শুল্ক কমিয়ে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনতে রাজি হয়েছে, অথচ বিনিময়ে ভারতীয় পণ্যের ওপর আমেরিকার শুল্ক কিন্তু শূন্য হয়নি; তা কেবল ৫০% থেকে কমিয়ে ১৮% করা হয়েছে। এই ভারসাম্যহীনতা ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য অসম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, ভারত কেন নিজের বিশাল বাজার আমেরিকার জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিল, যেখানে বিনিময়ে সমমানের সুবিধা পাওয়া যায়নি?
কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে আঘাত
সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হলো ভারতের কৃষিক্ষেত্র। চুক্তিতে বলা হয়েছে, ভারত মার্কিন কৃষিপণ্য যেমন—শুকনো শস্য, সয়াবিন তেল এবং ফলের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেবে। ভারতের মতো একটি কৃষিপ্রধান দেশে, যেখানে ক্ষুদ্র কৃষকরা ভর্তুকিপ্রাপ্ত বিদেশি পণ্যের সঙ্গে লড়াই করতে হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে মার্কিন বড় বড় কৃষি সংস্থার জন্য দরজা খুলে দেওয়া দেশীয় কৃষকদের পথে বসাতে পারে। বিরোধীরা একে ভারতীয় কৃষকদের নিরাপত্তার সঙ্গে আপস বলে চিহ্নিত করছেন।
কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও রুশ তেল
এই চুক্তির একটি অলিখিত শর্ত ছিল রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করা। আমেরিকা ভারতের ওপর যে অতিরিক্ত ২৫% ‘শাস্তিমূলক শুল্ক’ বসিয়েছিল, তা মূলত ছিল রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতার কারণে। এখন শুল্ক কমানোর বিনিময়ে রাশিয়ার সস্তা তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো ভারতের দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বা স্বাধীন বিদেশনীতিকে চাপের মুখে ফেলেছে। জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দিল্লির কোনো নির্দিষ্ট দেশের (যেমন আমেরিকা) ওপর অতি-নির্ভরশীল হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
স্বচ্ছতার অভাব
৫০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনার যে আকাশচুম্বী প্রতিশ্রুতি ভারত দিয়েছে, তার বাস্তবায়ন নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এত বড় অঙ্কের আমদানির চাপ ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া, সংসদের কোনো আলোচনা ছাড়াই এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নেওয়াকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন অনেকে।
পরিশেষে বলা যায়, ১৮% শুল্ক হ্রাসের সামান্য প্রাপ্তিকে ‘বিরাট জয়’ হিসেবে তুলে ধরা হলেও, বিনিময়ে ভারত যে বাজার সুবিধা এবং কৌশলগত অবস্থান হারিয়েছে, তার মূল্য দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি হতে পারে।

