নিজস্ব প্রতিবেদক, নিউজস্কোপ বাংলা: মধ্যপ্রাচ্যের (Middle East) রাজনৈতিক অঙ্গনে যেন এক প্রবল ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। এক রাতের ভয়াবহ বিমান হামলায় তছনছ হয়ে গেছে একটি গোটা পরিবার। ইরানের (Iran) নবনির্বাচিত সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনির (Mojtaba Khamenei) জীবনে নেমে এসেছে এক অকল্পনীয় শোক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States) এবং ইসরায়েলের (Israel) যৌথ সামরিক অভিযানে তার বাবা, মা, স্ত্রী ও সন্তানসহ পরিবারের অন্তত ৮ জন সদস্য নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। রাজধানী তেহরানে (Tehran) চালানো এই আকস্মিক হামলা বিশ্ব রাজনীতিকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জানা গেছে, এই বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন মোজতবার বাবা এবং দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা ইরানের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি (Ali Khamenei)। একই সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন তার মা মনসুরেহ খোজাসতেহ বাঘেরজাদেহ (Mansoureh Khojasteh Bagherzadeh), স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ-আদেল (Zahra Haddad-Adel) এবং তাদের এক তরুণ পুত্রসন্তান। এছাড়াও পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য, যার মধ্যে মোজতবার বোন, ভগ্নিপতি এবং ভাইয়ের ঘরের সন্তানেরাও রয়েছেন, তারাও এই বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছেন। একটি সাজানো গোছানো পরিবার কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেল, তা ভেবে শিউরে উঠছেন দেশের সাধারণ মানুষ।
একদিকে যখন মোজতবা তার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তাকে নিতে হয়েছে বিশাল এক দায়িত্ব। বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর ইরানের নীতি-নির্ধারণী পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’ তড়িঘড়ি করে ৫৬ বছর বয়সী মোজতবাকে দেশের নতুন সুপ্রিম লিডার হিসেবে বেছে নিয়েছে। ১৯৬৯ সালে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে (Mashhad) জন্মগ্রহণকারী মোজতবা ছিলেন তার বাবা-মায়ের ছয় সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। ১৯৯৯ সালে তিনি এক রক্ষণশীল রাজনীতিকের কন্যা জাহরাকে বিয়ে করেন। দীর্ঘ ২৭ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটল এমন এক মর্মান্তিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে, যা হয়তো তিনি দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেননি।
তিনি এখন ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা। কিন্তু ক্ষমতার এই শীর্ষাসনে বসার মুহূর্তটি তার জন্য কোনো আনন্দের বার্তা বয়ে আনেনি, বরং নিয়ে এসেছে স্বজন হারানোর তীব্র যাতনা এবং এক যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ। একজন স্বামী, একজন পিতা এবং একজন সন্তান হিসেবে মোজতবা যে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, তা কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাই পূরণ করতে পারবে না।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাতের অন্ধকারে তেহরানের আকাশে যুদ্ধবিমানের গগনবিদারী শব্দ এবং একের পর এক ভয়ংকর বিস্ফোরণে মাটি কেঁপে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যেই সর্বোচ্চ নেতার সুরক্ষিত বাসভবন এবং সংলগ্ন এলাকা কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ভোরে উদ্ধারকর্মীরা যখন একে একে নিথর দেহগুলো বের করে আনছিলেন, তখন পুরো এলাকাজুড়ে এক শোকাবহ ও হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। পরিবারের সদস্যদের মৃতদেহ দেখে শোকে পাথর হয়ে যান নবনিযুক্ত এই নেতা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা বরাবরই পর্দার আড়ালে থেকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে শক্ত ভূমিকা রেখে এসেছেন। কিন্তু এখন তাকে একেবারে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। শোককে শক্তিতে পরিণত করে তিনি কীভাবে দেশ পরিচালনা করবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ। এই নজিরবিহীন হামলার পর ইরানজুড়ে এখন ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনী—সবাই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। ইতিমধ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে দীর্ঘ শোক পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলও এই ঘটনায় গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই হামলার ফলে চলমান সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করবে এবং তা পুরো বিশ্বের জন্য এক ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। মোজতবা এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন যখন দেশের ভেতরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ এবং বাইরে যুদ্ধের দামামা বাজছে। শোকাহত এক নেতার পরবর্তী প্রতিটি পদক্ষেপ এখন বিশ্ববাসীর তীক্ষ্ণ নজরদারিতে থাকবে।

