গণতন্ত্রের মহোৎসবে আমরা ভোট দিই, আঙুলে কালির দাগ লাগাই এবং আশা করি, আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি আগামী পাঁচ বছর আমাদের কথা ভাববেন। কিন্তু ভোট মিটলেই যদি সেই নেতা বা নেত্রী ‘উধাও’ হয়ে যান? যদি প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবের মধ্যে তৈরি হয় যোজনব্যাপী দূরত্ব? সাধারণ মানুষের হাতে তখন আর কোনো ক্ষমতা থাকে না। তাঁদের অপেক্ষা করতে হয় আরও পাঁচটা বছর। এই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতেই কি ভারতের রাজনীতিতে উঠে আসছে ‘রাইট টু রিকল’ (Right to Recall) বা জনপ্রতিনিধিকে মেয়াদের মাঝপথেই ফিরিয়ে আনার দাবি?
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজ্যসভায় আম আদমি পার্টির সাংসদ রাঘব চাড্ডা (Raghav Chadha) যখন এই প্রস্তাব পেশ করলেন, তখন সংসদ ভবনের অলিন্দে ফের শোনা গেল ১৯২৪ সালের সেই পুরনো প্রতিধ্বনি। কংগ্রেস সাংসদ প্রমোদ তিওয়ারি একে “বিপজ্জনক” বলে অভিহিত করলেও, রাঘব চাড্ডা একে গণতন্ত্রের “ইনস্যুরেন্স পলিসি” বা বিমা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে কি সত্যিই মাঝপথে এমপি-বিধায়কদের ‘ছাঁটাই’ করা সম্ভব? আসুন, এই প্রশ্নের গভীরে ডুব দেওয়া যাক।
ইতিহাসের পাতা থেকে: শচীন্দ্রনাথ থেকে আম্বেদকর
ভারতে এই দাবি কিন্তু একেবারেই নতুন নয়। ১৯২৪ সালে বিপ্লবী শচীন্দ্রনাথ স্যানাল হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের (HRA) ইশতেহারে স্পষ্ট লিখেছিলেন, প্রতিনিধিদের ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা না থাকলে গণতন্ত্র এক “প্রহসনে” (Mockery) পরিণত হবে। ১৯৪৪ সালে প্রখ্যাত মানবতাবাদী এম.এন. রায়ও বিকেন্দ্রীভূত সরকার ব্যবস্থায় এই অধিকারের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। এমনকি ১৯৭৪ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণের ‘টোটাল রেভলিউশন’ বা সম্পূর্ণ বিপ্লবের ডাকের মধ্যেও এই দাবি ছিল জোরালো। পরবর্তীকালে প্রাক্তন লোকসভা স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ও জবাবদিহিতার স্বার্থে এর পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
কিন্তু সংবিধান প্রণেতারা, বিশেষ করে ড. বি.আর. আম্বেদকর, গণপরিষদে এই ধারণা খারিজ করে দিয়েছিলেন। দেশভাগের ক্ষতবিক্ষত সদ্য স্বাধীন ভারতে তখন দরকার ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আম্বেদকর ভয় পেয়েছিলেন, এই নিয়ম চালু হলে নির্বাচনী ক্ষেত্রগুলো একেকটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হবে, যেখানে পরাজিত প্রার্থীরা সারাক্ষণ জয়ী প্রার্থীকে টেনে নামানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকবেন। তাই ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে (ROPA) অযোগ্যতা বা কাজের গাফিলতিকে পদচ্যুতির কারণ হিসেবে রাখা হয়নি।
বিশ্বের দিকে নজর: ব্রিটেন বনাম তাইওয়ানের শিক্ষা
‘রাইট টু রিকল’ নিয়ে বিশ্বের নানা দেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। এখান থেকেই আমরা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই—একটি সফল মডেল, অন্যটি বিশৃঙ্খলার।
ব্রিটেনের সংযত মডেল: ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্য ‘রিকল অফ এমপি অ্যাক্ট’ চালু করে। সেখানে ভোটাররা চাইলেই শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে এমপিকে সরাতে পারেন না। এমপিকে সরানোর প্রক্রিয়া বা পিটিশন তখনই শুরু হয় যখন তিনি—
১. কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে জেল খাটেন।
২. পার্লামেন্ট বা এথিক্স কমিটি দ্বারা অন্তত ১০ দিনের জন্য সাসপেন্ড হন।
৩. মিথ্যে খরচের বিল জমা দিয়ে ধরা পড়েন।
পিটিশন শুরু হলে ৬ সপ্তাহের মধ্যে ১০% ভোটারের স্বাক্ষর লাগলে তবেই তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ, ব্রিটেনে এটি একটি ‘শাস্তিমূলক ব্যবস্থা’, কোনো রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়।
তাইওয়ানের বিশৃঙ্খলা: অন্যদিকে, তাইওয়ানের উদাহরণ আমাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা। সেখানে রাজনৈতিক কারণে রিকল করা যায়। ২০২৪-২৫ সালে তাইওয়ানে যখন রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়, তখন বিরোধীরা ‘গ্রেট রিকল মুভমেন্ট’ শুরু করে। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামে, ৩১ জন আইনপ্রণেতাকে সরানোর চেষ্টা চলে। অভিযোগ ছিল, বাজেট কমিয়ে দেশের সাবমেরিন ও ড্রোন প্রকল্পকে ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু শেষমেশ দেখা গেল, এই আন্দোলনে কাজের কাজ কিছুই হলো না, শুধু দেশটা একটা ‘কনস্ট্যান্ট ইলেকশন মোড’ বা চিরস্থায়ী নির্বাচনী আবহে চলে গেল। জনগণ ক্লান্ত হয়ে পড়ল, যাকে বলা হচ্ছে ‘রিকল ফ্যাটিগ’ (Recall Fatigue)।

ভারতের গ্রাম পঞ্চায়েতের অভিজ্ঞতা: এলিট ক্যাপচার
জাতীয় স্তরে না থাকলেও, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, বিহার বা হরিয়ানার মতো রাজ্যে পঞ্চায়েত স্তরে এই নিয়ম চালু আছে। ছত্তিশগড়ে ২০০৮ সালে তিনজন পুরপ্রধানকে এই প্রক্রিয়ায় সরানো হয়েছিল। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থানীয় স্তরে এই ক্ষমতা সাধারণ মানুষের হাতে থাকে না।
গ্রামের মোড়ল বা প্রভাবশালী উচ্চবর্ণের লোকেরা একে ব্যবহার করে দলিত বা পিছিয়ে পড়া শ্রেণির প্রতিনিধিদের সরানোর জন্য। একে বলা হয় ‘এলিট ক্যাপচার’ (Elite Capture)। হরিয়ানা বা উত্তরপ্রদেশে যেখানে পঞ্চায়েত সদস্যদের অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে প্রধানকে সরানো যায়, সেখানে এটি জাতিগত ও গোষ্ঠীগত দলাদলির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
বাস্তবায়নের পথে কাঁটা: নির্বাচন কমিশনের দুঃস্বপ্ন
ভারতের মতো দেশে, যেখানে ভোটার সংখ্যা ৯৫ কোটি ছাড়িয়েছে, সেখানে এই নিয়ম চালু করা এক প্রশাসনিক ও আর্থিক দুঃস্বপ্ন।
স্বাক্ষর যাচাই: রাঘব চাড্ডার প্রস্তাব অনুযায়ী, একটি লোকসভা কেন্দ্রে ৩৫-৪০ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর প্রয়োজন। অর্থাৎ, প্রায় ৫ থেকে ৮ লক্ষ সই বা বায়োমেট্রিক যাচাই করতে হবে! এই বিপুল কর্মযজ্ঞে জেলা প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের পুরো সময়টাই চলে যাবে।
খরচের বহর: ২০২৪ সালের নির্বাচনে দলগুলোর খরচ ধরা হয়েছিল প্রায় ১,০০,০০০ কোটি টাকা। মাঝপথে বারবার নির্বাচন হলে এই খরচ কোথায় গিয়ে ঠেকবে?
এক দেশ, এক নির্বাচন: মোদী সরকার যখন ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’-এর কথা বলছে যাতে বারবার ভোট না হয়, তখন ‘রাইট টু রিকল’ চালু করলে দেশজুড়ে সারাবছর কোথাও না কোথাও ‘মডেল কোড অফ কন্ডাক্ট’ (MCC) লেগেই থাকবে, যা উন্নয়নের কাজকে স্তব্ধ করে দেবে।
সাংবিধানিক সংকট: দশম তফশিল বনাম জনপ্রতিনিধি
সবচেয়ে বড় আইনি সমস্যাটি লুকিয়ে আছে সংবিধানের দশম তফশিলে (Tenth Schedule)। ভারতে ‘দলত্যাগ বিরোধী আইন’ অনুযায়ী, একজন এমপি বা বিধায়ক তাঁর দলের নির্দেশের (Whip) বাইরে ভোট দিতে পারেন না। দল যা বলবে, তাঁকে তাই করতে হবে।
এখন ভাবুন, আপনার এলাকার এমপি হয়তো আপনার কথা শুনতে চান, কিন্তু দলের নির্দেশে তিনি সংসদে এমন একটি বিলের পক্ষে ভোট দিলেন যা আপনি পছন্দ করেন না। এখন যদি আপনি তাঁকে ‘রিকল’ বা বরখাস্ত করেন, সেটা কি ন্যায়বিচার হবে? তিনি তো দলের কাছে হাতবাঁধা। ২০১৫ সালে আইন কমিশনের ২৫৫তম রিপোর্টেও এই কারণে ‘রাইট টু রিকল’-কে খারিজ করে বলা হয়েছিল, এটি হবে “Excess of Democracy” বা গণতন্ত্রের আধিক্য, যা ভালোর চেয়ে মন্দই বেশি করবে।
ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট (FPTP) সিস্টেমের বিপদ
ভারতে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনি যেতেন (FPTP)। অনেক সময় দেখা যায়, বিজয়ী প্রার্থী ৩০-৪০ শতাংশ ভোট পেয়ে জিতেছেন। অর্থাৎ, ৬০ শতাংশ মানুষ তাঁকে চাননি। রাঘব চাড্ডার প্রস্তাবে ৩৫-৪০ শতাংশ স্বাক্ষরের কথা বলা হয়েছে। এর মানে হলো, বিরোধীরা নির্বাচনের পরের দিন থেকেই ওই ৬০ শতাংশ মানুষকে একজোট করে সহজেই ৩৫ শতাংশ সই জোগাড় করে ফেলতে পারবে। ফলে জয়ী প্রার্থী ৫ বছর কাজ করার বদলে ৫ বছর নিজের গদি বাঁচাতে ব্যস্ত থাকবেন।
উপসংহার: আবেগের চেয়ে যুক্তি বড়
জনগণের ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তাইওয়ানের মতো রাজনৈতিক কারণে রিকল করার ক্ষমতা দিলে ভারত এক অস্থিরতার যুগে প্রবেশ করবে। উন্নয়ন লাটে উঠবে, আর রাজনীতি হবে শুধুই ‘ফ্রি-বি’ বা খয়রাতির প্রতিযোগিতা।
বরং ব্রিটেনের মডেলটি ভারতের জন্য পথপ্রদর্শক হতে পারে। যদি কোনো সাংসদ দুর্নীতি করেন, ফৌজদারি অপরাধে দোষী হন বা সংসদীয় কমিটি দ্বারা গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী সাব্যস্ত হন—শুধুমাত্র তখনই তাঁকে সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হোক। রাজনৈতিক মতপার্থক্য নয়, বরং নৈতিক স্খলনই হোক এমপিদের পদচ্যুতির একমাত্র কারণ। রাঘব চাড্ডার প্রস্তাবেও এই ‘অসদাচরণ’-এর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু তার সংজ্ঞা ও নির্ধারণ কে করবে—তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
‘রাইট টু রিকল’ একটি শক্তিশালী ধারণা, কিন্তু ভারতের জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটি একটি দ্বিধারী তলোয়ার। সঠিক রক্ষাকবচ ছাড়া এই তলোয়ার চালালে গণতন্ত্রের লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি।
