ক্যালেন্ডারের পাতায় ফাল্গুন মাসের শেষ দিন অর্থাৎ ফাল্গুন সংক্রান্তি। একদিকে বসন্তের মাতাল হাওয়া, অন্যদিকে ঋতু পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে ঘরে ঘরে হানা দেয় বসন্ত (Small Pox) বা হামের মতো চর্মরোগ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ অনেক উন্নত হলেও, এক সময় গ্রামবাংলার মানুষের কাছে এই রোগের মহৌষধ ছিল ভক্তি আর লোকবিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এক পিশাচরূপী দেবতা— ঘণ্টাকর্ণ (Ghantakarna), যাকে আপামর বাঙালি চেনে ‘ঘেঁটু’ নামে।আজকের আধুনিকমনস্ক নাগরিক সমাজে এই পুজোর চল প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ কয়েক দশক আগেও বাংলার গ্রামে গ্রামে ফাল্গুনী সন্ধ্যায় শোনা যেত শিশুদের সমবেত কণ্ঠের ‘ঘেঁটু গান’। সময়ের নিয়মে সেই ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তপ্রায়।
কে এই ঘেঁটু দেবতা? পুরাণের পিশাচ থেকে লোকদেবতা
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, ঘণ্টাকর্ণ ছিলেন মহাদেব শিবের (Lord Shiva) একনিষ্ঠ অনুচর। কিন্তু তাঁর একটি অদ্ভুত স্বভাব ছিল— তিনি বিষ্ণুর (Lord Vishnu) নাম সহ্য করতে পারতেন না। শ্রীহরির নাম যাতে কানে না ঢোকে, তাই তিনি নিজের দুই কানে দুটি বড় ঘণ্টা বেঁধে রাখতেন। এই কারণেই তাঁর নাম হয় ঘণ্টাকর্ণ।লোককথা বলে, বিষ্ণুবিদ্বেষের কারণে তিনি অভিশপ্ত হয়ে পিশাচরূপে মর্ত্যে আসেন এবং চর্মরোগে আক্রান্ত হন। পরবর্তীতে তাঁর রোগমুক্তি ঘটে এবং তিনি সাধারণ মানুষের কাছে চর্মরোগ নিরাময়কারী লোকদেবতা হিসেবে পরিচিতি পান। বিশেষত খোস-পাঁচড়া বা চুলকানির মতো চর্মরোগ থেকে মুক্তি পেতেই গ্রামবাংলার মায়েরা ‘ঘেঁটু’র আরাধনা শুরু করেন।
আচারের বৈচিত্র্য: হাড়িপুজো থেকে ভুসোকালি
ঘেঁটু পুজোর কোনো নির্দিষ্ট মন্দির বা মৃন্ময় মূর্তি সচরাচর দেখা যায় না। এর আচার-আচরণ সম্পূর্ণ গ্রাম্য ও প্রতীকী। ফাল্গুন সংক্রান্তির ভোরে গ্রামের মহিলারা কুলোর ওপর একটি মাটির হাঁড়ি ভুসোকালি মাখিয়ে উল্টো করে বসিয়ে দেন। তার ওপর গোবরের তাল দিয়ে চোখ ও সিঁদুরের টিপ পরিয়ে তৈরি করা হয় প্রতীকি মুখ।এই পুজোর কোনো বৈদিক মন্ত্র নেই। পুজোর শেষে গ্রামের কচিকাঁচারা বাঁশ দিয়ে সেই হাঁড়িটি ভেঙে ফেলে। বিশ্বাস করা হয়, হাঁড়ি ভাঙার সাথেই পাড়ার সমস্ত রোগ-বালাই বিদায় নিল। অনেকে সেই হাঁড়ির ভুসোকালি চোখে কাজলের মতো পরেন, যাতে চোখের রোগ না হয়।
‘ঘেঁটু গান’ ও ডুলি উৎসবের স্মৃতি
এই উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো ‘ঘেঁটু গান’। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কলাগাছের খোল (Bakol) দিয়ে ছোট ছোট ‘ডুলি’ বা দোলা তৈরি করে। তাতে বুনো ঘেঁটু ফুল দিয়ে সাজিয়ে প্রদীপ জ্বালানো হয়। এরপর বাড়ি বাড়ি ঘুরে তারা গান গায়:
“ঘেঁটু যায় ঘেঁটু যায়, খোস পালায়/ যে দেবে মুঠো মুঠো, তার হবে হাত ঠুঁটো…”
এই ছড়া কেটে তারা চাল, ডাল ও পয়সা সংগ্রহ করে। এরপর চৈত্র সংক্রান্তিতে (Chaitra Sankranti) সেই সংগৃহীত সামগ্রী দিয়ে চড়ুইভাতি বা ভোজের আয়োজন করা হয়। এটি ছিল গ্রামবাংলার সামাজিক সংহতির এক অনন্য রূপ।
প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন
মজার বিষয় হলো, এই পুজোর সাথে জড়িয়ে থাকা ঘেঁটু ফুল (Clerodendrum viscosum) আসলে একটি ভেষজ গুণসম্পন্ন উদ্ভিদ। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে এই ফুলের রস চর্মরোগ সারাতে অত্যন্ত কার্যকরী বলে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ, ধর্মীয় আচারের আড়ালে পূর্বপুরুষরা আসলে প্রকৃতির এই ঔষধি গুণের সাথেই সাধারণ মানুষের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
উপসংহার
আজকের স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের যুগে ‘ঘেঁটু গান’ আজ স্তব্ধ। মাটির হাঁড়ি ভাঙার সেই উল্লাসও আর দেখা যায় না। তবে এই বিলুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতি আমাদের শিকড়ের কথা বলে। আধুনিক চিকিৎসা অবশ্যই অপরিহার্য, কিন্তু যে লোকবিশ্বাস একদিন বাংলার গ্রামগুলোকে একসূত্রে বেঁধে রাখত, সেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।


Recent Comments