পশ্চিমবঙ্গে (West Bengal) বেসরকারি বাস ও মিনিবাস পরিষেবা কার্যত ‘কোমায়’ আচ্ছন্ন। একদিকে যেমন ক্রমশ বাড়ছে জ্বালানির দাম, অন্যদিকে ২০১৮ সালের পর থেকে বাসের ভাড়া এক পয়সাও বৃদ্ধি পায়নি। করোনা মহামারীর বিশাল ধাক্কা সামলে ওঠার পর, এই জোড়া ফলায় বিদ্ধ হয়ে বেসরকারি পরিবহন ব্যবস্থা আজ ধুঁকছে। বাস মালিকরা চরম আর্থিক সংকটের মুখে। এই জ্বলন্ত সমস্যাগুলির সমাধানের জন্য এবার রাজ্য সরকারের পরিবহন দপ্তরের কাছে দ্রুত আলোচনার আর্জি জানাল জয়েন্ট কাউন্সিল অফ বাস সিন্ডিকেটস (Joint Council of Bus Syndicates)।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক তপন ব্যানার্জী (Tapan Banerjee) পরিবহন সচিবের কাছে একটি চিঠি দিয়ে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন এবং মোট ১০ দফা দাবি পেশ করেছেন।গত ১৮ মে, কলকাতা (Kolkata) শহরের ১২ নম্বর আর.এন. মুখার্জি রোড (R.N. Mukherjee Road) স্থিত পরিবহন ভবন (Paribahan Bhavan) -এ এই স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, সম্প্রতি ডিজেলের দাম আরও ১১ পয়সা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাস মালিকদের আয়ের কোনো নতুন পথ নেই। ২০১৮ সালের পর থেকে বাস ভাড়া বৃদ্ধির আলোচনার সমস্ত দরজা যেন রাজ্য সরকারের তরফ থেকে বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
তপনবাবু তাঁর চিঠিতে গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেছেন, কোভিড (Covid) মহামারীর পর থেকে রাজ্যের বেসরকারি পরিবহন ব্যবস্থা একেবারে মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে আছে। এখনই সরকার যদি হস্তক্ষেপ না করে, তবে আগামী দিনে রাস্তায় বেসরকারি বাস চালানো একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়বে।জয়েন্ট কাউন্সিল অফ বাস সিন্ডিকেটস কেবলমাত্র শহরকেন্দ্রিক কোনো সংগঠন নয়। উত্তরবঙ্গ (North Bengal) থেকে শুরু করে দক্ষিণবঙ্গের সাগর পর্যন্ত সমস্ত জেলার বাস মালিকরাই এই সংগঠনের সদস্য। তাই কলকাতা এবং অন্যান্য জেলার সমস্যার মধ্যে কিছু দৃশ্যমান পার্থক্য থাকলেও, বাস মালিকদের সার্বিক সংকট সর্বত্রই এক।
এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি পেতে তপন ব্যানার্জীর নেতৃত্বে সংগঠনটি যে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেছে, তা হলো:
১. অবিলম্বে বাস ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের সাথে আলোচনা শুরু করতে হবে।
২. বাস ভাড়া বৃদ্ধিসহ পরিবহন সংক্রান্ত অন্যান্য সার্বিক বিষয়ে একটি রেগুলেটরি বা নিয়ন্ত্রক কমিটি গঠন করতে হবে।
৩. আদালতের নির্দেশ মেনে জাতীয় সড়ক (National Highway) এবং রাজ্য সড়কগুলিতে (State Highway) অবিলম্বে টোটো এবং অটো চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
৪. রাজ্যের বেশ কিছু জেলায় অতিরিক্ত টোল ট্যাক্সের কারণে বাস চালানো কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবিলম্বে এর সুরাহা প্রয়োজন।
৫. ওই সমস্ত জেলায় টোলের টাকা সরাসরি যাত্রীদের (Passenger) টিকিটের দামের সাথে যুক্ত করার অনুমতি দিতে হবে।
৬. প্রতিটি আরটিএ (RTA) বা রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট অথরিটিতে ‘ওয়ান উইন্ডো’ (One Window) ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে বাস মালিকদের দাপ্তরিক কাজে অহেতুক হয়রানি কমে।
৭. কলকাতা ট্রাফিক পুলিশের (Traffic Police) হয়রানি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
৮. অনেক ক্ষেত্রে দিনে বাসের যা আয় হয়, তার চেয়ে বেশি টাকার পুলিশের ফাইন বা জরিমানা দিতে হচ্ছে, যা বাস মালিক ও চালকদের পক্ষে একেবারেই বহন করা সম্ভব নয়।
৯. রাস্তায় কোথায় বাস থামবে এবং যাত্রীরা কোথায় দাঁড়াবেন, তার জন্য নির্দিষ্ট স্টপেজ (Stoppage) থাকা ভীষণ দরকার। যত্রতত্র বাস দাঁড় করানো নিয়ে জটিলতা এড়াতে হবে।
১০. কেবল ট্রাফিক ফাইন আদায় করলেই দুর্ঘটনা কমবে না। দুর্ঘটনা কমানোর জন্য ধারাবাহিক ভাবে চালক এবং পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক তপন ব্যানার্জী জানিয়েছেন, বেসরকারি পরিবহন ব্যবস্থার এই জ্বলন্ত সমস্যাগুলো নিয়ে তাঁরা দ্রুত পরিবহন সচিবের সাথে আলোচনায় বসতে চান। রাজ্য সরকার এবং পরিবহন দপ্তরের আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া এই খাদের কিনারা থেকে বেসরকারি বাস শিল্পকে বাঁচানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সাধারণ যাত্রীরাও প্রতিদিন রাস্তায় বেরিয়ে বাসের অভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন


Recent Comments