নিজস্ব সংবাদদাতা : প্রায় চৌদ্দ বছর আগে পার্ক স্ট্রিট গণধর্ষণ মামলার তদন্তে সাহসী ও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে যিনি রাজ্যজুড়ে আলোচনায় উঠে এসেছিলেন, সেই আইপিএস অফিসার দময়ন্তী সেন ফের একবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। নারী নির্যাতন ও সংবেদনশীল অপরাধের তদন্তে গঠিত বিশেষ কমিটির সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। প্রশাসনিক মহলের মতে, এই নিয়োগ শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং আইন ও ন্যায়ের প্রতি সরকারের অবস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
২০১২ সালের বহুচর্চিত পার্ক স্ট্রিট গ্যাং রেপ কেস সেই সময় গোটা পশ্চিমবঙ্গকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কলকাতার অভিজাত পার্ক স্ট্রিট এলাকায় গভীর রাতে এক মহিলাকে চলন্ত গাড়ির ভিতরে গণধর্ষণের অভিযোগ সামনে আসতেই তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় কলকাতা পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার (ক্রাইম) হিসেবে তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন দময়ন্তী সেন।
তদন্তের শুরু থেকেই তিনি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, অভিযুক্তদের গতিবিধি খতিয়ে দেখা এবং প্রযুক্তির সাহায্যে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে গিয়ে খুব দ্রুতই মূল অভিযুক্ত কাদের খান-সহ একাধিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয় পুলিশ। তাঁর নেতৃত্বে তদন্তে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে।
কিন্তু ঘটনার তদন্ত যত এগোতে থাকে, ততই তা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রকাশ্যে ঘটনাটিকে “সাজানো” বা “চক্রান্ত” বলে মন্তব্য করায় নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। সেই পরিস্থিতিতে দময়ন্তী সেনের তদন্ত কার্যত প্রমাণ করে দেয় যে নির্যাতিতার অভিযোগ সত্য ছিল। প্রশাসনের একাংশের দাবি, সত্য উদঘাটনে আপসহীন থাকার কারণেই পরে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেই বদলি ঘিরে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছিল বিভিন্ন মহলে।
দীর্ঘ সময় প্রশাসনের সামনের সারি থেকে অনেকটাই দূরে থাকার পর আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ফিরলেন তিনি। বর্তমানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-র প্রশাসনের অধীনে নারী সুরক্ষা সংক্রান্ত বিশেষ তদন্ত কমিটির সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন দময়ন্তী সেন। এই কমিটির মূল লক্ষ্য রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নারী নির্যাতন, বিশেষ করে তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি ও সংখ্যালঘু মহিলাদের উপর অত্যাচারের অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা।
প্রশাসনিক মহলের মতে, দময়ন্তী সেনের অভিজ্ঞতা, কঠোর মনোভাব এবং তদন্ত দক্ষতা এই কমিটির কাজে বড় ভূমিকা নেবে। বহু মানুষ ইতিমধ্যেই তাঁর প্রত্যাবর্তনকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। সামাজিক মাধ্যমেও অনেকেই লিখেছেন, “সত্যের জন্য লড়াই করা অফিসার আবার ফিরলেন দায়িত্বে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, দময়ন্তী সেনের এই প্রত্যাবর্তন শুধুমাত্র একজন অফিসারের পুনর্বাসন নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। নারী নিরাপত্তা ও সংবেদনশীল অপরাধের তদন্তে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার দাবি যখন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে, তখন তাঁর মতো অভিজ্ঞ অফিসারের সামনে আসা নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

Recent Comments