অশোক সেনগুপ্ত
১৫বছর রাজত্বের শেষে কেবল ভোটে পরাজয় নয়, প্রতিদিন একটু একটু করে খসে পড়ছে দলের ভিত। পদ ত্যাগ করছেন সংগঠন এবং পুর-প্রতিনিধিরা। দলনেত্রীর আবেদনেও কাজ হয়নি। এই অবস্থায় বৃহস্পতিবার ফেসবুক এবং এক্সবার্তায় আবেগঘন বার্তা দিয়ে তৃণমূলের ধ্বস আটকানোর ব্রতী হলেন দলের মুখপাত্র ও বিধায়ক কুণাল ঘোষ।
তিনি লিখেছেন, “তৃণমূলের সহকর্মীদের কাছে সবিনয় নিবেদন। ভোট পরবর্তী পর্যায়ে আমাদের মধ্যেই কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। তৃণমূলে বিদ্রোহ, ভাঙন, ভেঙে পড়া, দলত্যাগের ইঙ্গিত বলে যা প্রচারিত হচ্ছে। যে বা যারা এক মাসও হয়নি জিতেছেন, হেরেছেন, বা মনোনয়নের ইচ্ছা থাকলেও পাননি, এই দলটাকেই ভালো বলে প্রচার করেছেন, তাঁদেরও অনেকেই এখন দলের ভুলগুলি নিয়ে বলছেন।
দল ক্ষমতায় এলে যাঁরা মন্ত্রিত্বের জন্য দিদির কাছে, অভিষেকের কাছে লবি করতেন, তাঁরাও অন্য সুরে কথা বলছেন। দল যদি এত খারাপ, প্রার্থী হলেন কেন? সে যাক, তাঁরা যে কথাগুলো বলছেন, সবটাই ভুল নয়। নির্বাচন কমিশনের চক্রান্ত তো ছিলই; কিন্তু আমাদের ভুলও অবশ্যই ছিল। সেগুলো পর্যালোচনা দরকার। এসব বলতে গিয়ে আমি নিজেও সাম্প্রতিক অতীতে একাধিকবার সাসপেন্ড হয়েছি, সেন্সরড হয়েছি। তখন কিন্তু আজকের বিপ্লবীরা কেউ প্রতিবাদ করেননি, পাশে ছিল শুধু ব্রাত্য।
দলে একশ্রেণীর স্তাবক, সুবিধাবাদী, ফেরেব্বাজ, অন্য স্রোত থেকে ধান্দায় ভেসে আসা লোকজন, একটা বিচিত্র শ্রেণী গুরুত্ব পেয়েছে। নেতার ফ্যান ক্লাব, সচিবের ফ্যান ক্লাব, ফ্যানের ফ্যান ক্লাব কালচার তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন, এই কঠিন সময়ে আমরা ক্ষোভ, বিদ্রোহ করব, নাকি আক্রান্ত কর্মীদের পাশে থেকে দলকে সংগঠিত করব?
মমতাদিকে দেখে এত মানুষ ভোট দিয়েছেন। ‘গেল গেল’ রবে আমরা কেন থমকে যাচ্ছি? দল ক্ষমতায় থাকলে আমরা আছি, ক্ষমতায় না থাকলেই এত লোকের একসঙ্গে শ্বাসকষ্ট, এটা ভারি দৃষ্টিকটূ। আজ তৃণমূল দুর্বল, তাই জল মাপার চেষ্টা অনেকের মধ্যে। এটা নিজেদের জন্যেও সম্মানজনক নয়। ভালোয় ছিলাম, খারাপ দিনে, এক মাসও হয়নি, এত কষ্ট? এই দলই তো সম্মান, পদ, জনপ্রতিনিধিত্ব, ইত্যাদি দিয়েছে। কেউ কেউ তার অপব্যবহারও করেছেন, মানতে হবে। আজ এক মাস হল না ভোটের, এখনই এত কথা?
আমার মনে হয়, আসুন, এখন 1) আক্রান্ত কর্মীদের পাশে থাকি। 2) দলের কাজ, জনস্বার্থের কর্মসূচি আবার শুরু করি। কেন্দ্র বা রাজ্যের জনবিরোধী নীতির প্রতিবাদ করি। এবং 3) দলের যাবতীয় ভুলত্রুটি, দলের মধ্যে খোলাখুলিভাবে আলোচনা করে দলটাকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করি। নেতৃত্ব যদি ভুল সংশোধনের পথে না যান বা স্পষ্ট করে সমস্যা বলার পরেও তার সমাধান না করা হয়, তখন বিকল্প ভাবনা ভাববেন।
এখন দলটাকে পুনর্গঠিত করা জরুরি, মমতাদির নেতৃত্বে। এই দলের উপর রাগ, অভিমান করার অধিকারের যদি কোনো তালিকা থাকে, এক নম্বর নাম কুণাল ঘোষের। বিনা দোষে আমার থেকে বেশি যন্ত্রণা কেউ পায়নি এই দলে। তারপরেও আমি সহকর্মীদের অনুরোধ করছি, দল এবং বাংলার এই কঠিন সময়ে মমতাদির নেতৃত্বে তৃণমূলকে ঘুরে দাঁড় করানো জরুরি। আমি মনে করি বহু কর্মী তৈরি। মানুষও আছেন। কিন্তু নেতারা কেউ অদৃশ্য, কেউ বিপ্লবী, কম সংখ্যক দৃশ্যমান। এটা হতে পারে না।
দলের ভেতর থেকেই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা হোক। সর্বাত্মক চেষ্টা হোক। তাতে কাজ না হলে যে যা ভাবছে, পথ খোলা। মমতাদির নেতৃত্বে একজন সৈনিক হিসেবে আছি। যেটা উচিত মনে করব, বলব। দলকে কর্মীদের পাশে, মানুষের পাশে রাখার চেষ্টা করব। যদি দেখি দল ভুলের পথেই আছে, তখন দেখা যাবে। তার আগে পর্যন্ত দলকে মজবুত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাব। আলেকজান্ডার নাই বা হলাম, পুরুর সম্মানটাই থাক। বাকিটা সময় পথ দেখাবে।”
বৃহস্পতিবার ফেসবুক পোস্টে এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর ৬ ঘন্টায় ৬২২টি প্রতিক্রিয়া এসেছে। এতে কুণালের সমর্থনে যেমন অনেকে মন্তব্য করেছেন, বিরোধিতাও করেছেন অনেকে।


Recent Comments