ভোটের বাদ্যি এখনও সরকারিভাবে বাজেনি, কিন্তু ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা ইতিমধ্যেই বেজে গেছে বাংলার রাজনীতিতে। আর সেই উত্তাপ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। গত সপ্তাহে বঙ্গ সফরে এসে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে তিনি স্পষ্ট টার্গেট বেঁধে দিয়েছেন—”আগামী বিধানসভা নির্বাচনে বাংলা থেকে বিজেপিকে ৫০ শতাংশ ভোট পেতে হবে।” শাহের এই মন্তব্য ঘিরেই এখন তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। আজ, বৃহস্পতিবার তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই দাবির কড়া প্রতিক্রিয়া এল।
বিজেপির অঙ্ক কী? বিজেপির অন্দরমহলের খবর, লোকসভা নির্বাচনে আশানুরূপ ফল না হওয়ার পর এবার বিধানসভাকে ‘ডু অর ডাই’ হিসেবে দেখছে গেরুয়া শিবির। অমিত শাহ রাজ্য নেতৃত্বকে বুথ স্তরে সংগঠন মজবুত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর দাবি, সন্দেশখালি থেকে শুরু করে আরজি কর কাণ্ড—রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং দুর্নীতির জেরে মানুষ তৃণমূলের ওপর বীতশ্রদ্ধ। এই ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ বা প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে কাজে লাগিয়েই ৫০ শতাংশ ভোট শেয়ারের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে চায় বিজেপি। দলের রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার আজ সকালে নিউ টাউনে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে বলেন, “অমিত জি যা বলেন, ভেবেচিন্তেই বলেন। বাংলার মানুষ পরিবর্তন চাইছে, আর সেই পরিবর্তন ইভিএমেই দেখা যাবে।”
তৃণমূলের পাল্টা কটাক্ষ: শাহের এই দাবিকে ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। আজ তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠকে দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, “যাঁরা নিজেদের বিধায়ক-সাংসদদের ধরে রাখতে পারেন না, তাঁরা আবার ৫০ শতাংশ ভোটের স্বপ্ন দেখছেন! এটা দিবাশপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়।” তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, “২০২১-এ ওরা বলেছিল ‘ইস বার ২০০ পার’, আর মানুষ ওদের ৭৭-এ আটকে দিয়েছিল। এবার তো ওদের জামানত জব্দ হওয়ার উপক্রম হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনমুখী প্রকল্পের সুফল বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। মানুষ উন্নয়নের সঙ্গেই আছে।”
রাজনৈতিক মহলের বিশ্লেষণ: রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়া বাংলার রাজনীতিতে যেকোনো দলের পক্ষেই কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে যখন ত্রিমুখী লড়াইয়ের (তৃণমূল, বিজেপি এবং বাম-কংগ্রেস জোট) সম্ভাবনা থাকে। প্রবীণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বিশ্বনাথ চক্রবর্তীর মতে, “অমিত শাহ কর্মীদের মনোবল বাড়াতেই হয়তো এত বড় টার্গেট দিয়েছেন। তবে রাজনীতিতে অসম্ভব বলে কিছু হয় না। বাম ও কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্ক কোন দিকে সুইং করছে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।”
সিপিএম-এর প্রতিক্রিয়া: এই দুই ফুলের লড়াইয়ে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা বোঝাতে আসরে নেমেছে বামেরা। সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম বলেছেন, “তৃণমূল আর বিজেপি—দুটো দলই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। মানুষ এবার বিকল্পের সন্ধান করছে। ৫০ শতাংশের গালভরা বুলি আউড়ে মানুষের পেট ভরবে না।”
সব মিলিয়ে, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে ‘পার্সেন্টেজ পলিটিক্স’ এখন তুঙ্গে। অমিত শাহের এই ৫০ শতাংশের টার্গেট কি বাস্তবে মিলবে, নাকি তা নিছকই রাজনৈতিক জুমলা হয়েই থেকে যাবে—তা তো সময় এবং বাংলার জনতাই বলবে। তবে আপাতত কথার লড়াইয়ে সরগরম কলকাতা।
