সিনেমা জগতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ ‘অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস’ বা অস্কার (Oscars)। কিন্তু এই মঞ্চের ৯৭ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে একটি বিভাগ ছিল কার্যত অভেদ্য দুর্গের মতো, যেখানে কোনো নারীর প্রবেশাধিকার থাকলেও মেলেনি চূড়ান্ত স্বীকৃতি। অবশেষে সেই অচলায়তন ভাঙল। ২০২৬ সালের ৯৮তম অস্কারের মঞ্চে সেরা সিনেমাটোগ্রাফার (Best Cinematography) হিসেবে পুরস্কার জিতে ইতিহাস গড়লেন অটাম ডুরাল্ড আরকাপাউ (Autumn Durald Arkapaw)। রায়ান কুগলার (Ryan Coogler) পরিচালিত অতিপ্রাকৃত হরর-থ্রিলার সিনেমা ‘সিনার্স’ (Sinners)-এর জন্য এই সম্মান পেলেন তিনি।
এক শতাব্দীর বৈষম্যের অবসান
১৯২৯ সালে অস্কারের যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে সিনেমাটোগ্রাফি বা চলচ্চিত্রের আলোকচিত্র গ্রহণ বিভাগে পুরুষদেরই আধিপত্য ছিল। ক্যামেরা হ্যান্ডলিং এবং কারিগরি এই কাজটিকে দীর্ঘকাল ধরে ‘পুরুষদের কাজ’ হিসেবে দেখা হয়েছে। গত রাতে যখন অটাম তাঁর হাতে সোনালি ট্রফিটি তুলে নিলেন, তখন তিনি কেবল ব্যক্তিগত কোনো অর্জন উদযাপন করছিলেন না, বরং বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন। তিনি প্রথম নারী এবং প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী (Woman of Colour) হিসেবে এই অস্কার জিতলেন।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে নারীদের কুর্নিশ
পুরস্কার গ্রহণের সময় অটামের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে লড়াই এবং সংহতির সুর। তিনি ডলবি থিয়েটারের (Dolby Theatre) উপস্থিত সমস্ত নারীদের দাঁড়িয়ে সম্মান জানানোর অনুরোধ করেন। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি চাই এই ঘরে উপস্থিত সমস্ত নারীরা একবার উঠে দাঁড়ান। কারণ আপনাদের লড়াই এবং উপস্থিতি ছাড়া আমি আজ এই জায়গায় পৌঁছাতে পারতাম না।” ফিলিপিনো এবং আফ্রিকান-আমেরিকান বংশোদ্ভূত অটাম কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তাঁর পরিচালক রায়ান কুগলারকেও, যাঁর সাথে তিনি এর আগে ‘ব্ল্যাক প্যান্থার: ওয়াকান্ডা ফরএভার’ (Black Panther: Wakanda Forever)-এ কাজ করেছিলেন।
প্রযুক্তিগত কৃতিত্বে বিশ্বজয়
অটামের এই জয় কেবল লিঙ্গবৈষম্য দূর করার কারণেই নয়, বরং তাঁর অসাধারণ কারিগরি দক্ষতার জন্যও। ‘সিনার্স’ সিনেমার শুটিংয়ের জন্য তিনি আইম্যাক্স ৬৫ মিমি (IMAX 65mm) এবং আল্ট্রা প্যানাভিশন (Ultra Panavision) ক্যামেরা ব্যবহার করেছেন। তিনি বিশ্বের প্রথম নারী সিনেমাটোগ্রাফার যিনি এই ধরণের ভারী এবং জটিল প্রযুক্তিতে কাজ করার সাহস দেখিয়েছেন।এর আগে মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন নারী এই বিভাগে মনোনীত হয়েছিলেন। ২০১৭ সালে র্যাচেল মরিসন (Rachel Morrison), ২০২১ সালে আরি ওয়েগনার (Ari Wegner) এবং ২০২২ সালে ম্যান্ডি ওয়াকার (Mandy Walker) মনোনয়ন পেলেও জয়ের স্বাদ পাননি। অটামের এই সাফল্য বিশ্বের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে থাকা সেই সমস্ত নারীদের জন্য আশার আলো, যারা ক্যামেরার নেপথ্যে কাজ করার স্বপ্ন দেখেন।
এক নতুন ভোরের ইঙ্গিত
সিনেমা সমালোচকদের মতে, এটি কেবল একটি অ্যাওয়ার্ড নয়, এটি একটি মুক্তি। প্রায় ১০০ বছর ধরে যে লিঙ্গভিত্তিক স্টিরিওটাইপ (Gender Stereotype) চলচ্চিত্র শিল্পকে আঁকড়ে ধরে ছিল, অটামের এই ট্রফি তা চুরমার করে দিল। এটি প্রমাণ করল যে, মেধা এবং দৃষ্টিশৈলীর কোনো লিঙ্গ হয় না। সিনেমাটোগ্রাফির মতো কারিগরি বিভাগে একজন নারীর এই বিশ্বজয় আগামী প্রজন্মের অগণিত মেয়েদের অনুপ্রাণিত করবে যারা লেন্সের ওপার থেকে পৃথিবীকে দেখার স্বপ্ন দেখেন।


Recent Comments