অশোক সেনগুপ্ত
দেওয়াল তুমি কার?
—“রাজ্যে যারা ক্ষমতায়, সেই দলের।”
উত্তরটা কেবল আজকের নয়। বিশ-ত্রিশ বছর আগেও ছবিটা ছিল এরকম। সে সময় দেওয়ালই ছিল প্রার্থী ও দলের প্রচারের মূল মাধ্যম। এখন প্রযুক্তি বহুদূর এগিয়েছে। সামাজিক মাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধি-র (এআই) কেরামতির দৌলতে প্রচার এখন রীতিমত ‘হাই টেক’। তবু দেওয়াল রয়েছে স্বমহিমায়। দেওয়াল লিখন নিয়ে অশান্তির খবরও মিলছে বহু জায়গা থেকে।
পাড়ায় পাড়ায় এখন দেওয়ালে লেখায় ব্যস্ত বিভিন্ন দলের সমর্থকরা। সোমবার সন্ধ্যার পর সেন্ট্রাল রোডের কাছে দেওয়ালে বাবু সাহা (৬১) লিখছিলেন ‘নো ভোট টু বিজেপি’। প্রশ্নের উত্তরে এই প্রতিবেদককে বলেন, “কাছেই বাড়ি। ৪০ বছর ধরে ভোটের প্রচারের লেখা লিখছি।
ওই দেওয়ালের ঠিক পাশে অনেকটা অংশ নিয়ে রঙ তুলিতে তৃণমূল প্রার্থীর প্রচার করছিলেন ঝুঁটিবাঁধা এক যুবা। সবিনয়ে নাম জানতে চাইতেই রুক্ষভাবে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “আপনি কে? সাংবাদিক?” ‘হ্যাঁ’ জবাব দিতেই ঝুঁটিওয়ালার চকিত জবাব, “বলব না। পরে আসবেন! বিরক্ত করছেন কেন”?
সেন্ট্রাল রোড ধরে যাদবপুরের দিকে আরও মিনিট দশ এগোতে রাস্তার ডান দিকের দেওয়ালে সাদা রঙ করা অংশে এক যুবা একটি বড় ঘাসফুলের ছবি এঁকে আর একটি আঁকতে উদ্যোগী হয়েছেন। প্রশ্ন করে জানলাম, নাম ইন্দ্রজিৎ সরকার। রাজ্যের যুব কল্যাণ দফতরের কর্মী। প্রচার করছেন দফতরের মন্ত্রী অরুপ বিশ্বাসের হয়ে। বললেন, “ বাড়ি ফিরে সন্ধ্যার পর কতটুকু আর সময় পাই। তার মধ্যেই যতটা পারা যায়!” আনুমানিক ২০ বর্গফুট অংশে একটা ঘাসফুলের ছবি আঁকতে সময় লাগে মিনিট ২৫।






কয়েক দশক আগে দেওয়াল-লিখনে প্রার্থীর নাম আর প্রতীকের চেয়েও বেশি মাত্রা পেত নানা ছড়া। যেমন— “ভোট দেবেন কিসে/ কাস্তে ধানের শীষে’। আবীর কর লিখেছেন, “১৯৬৯-এর নির্বাচনে দুই প্রতিযোগী দল, কংগ্রেস ও যুক্তফ্রন্ট। আগের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জিতেছিল, তাই বরানগর, ঢাকুরিয়া, যাদবপুরে দেওয়াল জুড়ে কংগ্রেসের ছড়া: ‘যুক্তফ্রন্টে কী পেলাম/ গুলি-বুলি-লাল সেলাম।’ অন্য দেওয়াল লিখন: ‘শুন হে দেশের ভাই/ যুক্তফ্রন্টে গদিই সত্য/ দেশপ্রেম কিছু নাই।’ আর: ‘গত ভোটের ভুলের মাসুল দিলাম ন’মাস ধরে/ ফ্রন্টবাবুদের ভোট দিয়ে টের পেলাম হাড়ে হাড়ে।’ এ ছাড়া, উত্তম-সুচিত্রার ‘শাপমোচন’ ছবির গানের আদলে: ‘শোনো বন্ধু শোনো—/ ফ্রন্টের ঐ ন-মাসের ইতিকথা/ চোদ্দ জনের গোঁজামিলের/ সে এক বীভৎসতা।/ ওদের নীতি নেই/ ওদের স্থিতি নেই/ ভাঁওতা দিতেই— ভুল বোঝাতেই/ ওদের দক্ষতা।’’
ভোটের ছড়া পশ্চিমবঙ্গের মতো আর কোন রাজ্যে এতটা মাত্রা পেয়েছে জানি না। এখনও ভোটের আগে ইটের দেওয়াল এবং মুঠোফোনে সামাজিক মাধ্যমের দেওয়ালে ছড়া একটা বিবেচ্য বিষয়। যেমন—
“চুরি লুঠপাট কেজির দরে/হারবে মেয়ে ভবানীপুরে”। বা, “নারী নির্যাতন ঘরে ঘরে/অভয়া কান্ড আর জি করে”। কেউ লিখছেন, “আর নেই দরকার, এই চোরেদের সরকার”।
দেওয়ালে কোথাও আঁকা সাপের ছবি। এর পাশে লেখা— “পদ্মফুলে দিলে ছাপ/ ঘরে ঢুকবে কেউটে সাপ”। এটা তৃণমূলের প্রচার। আবার, যাদবপুরে সেন্ট্রাল রোডে রঙ করা একটি দেওয়ালে লিখনের বদলে চোখে পড়ল বিকাশ ভট্টাচার্যের ফ্লেক্স।
কংগ্রেস আমলে দেওয়া লিখনের প্রচারে ব্যক্তিগত আক্রমণ ছিল: ‘আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুুম সাজে/ সেন প্রফুল্ল, ঘোষ প্রফুল্ল, আর অতুল্য নাচে।’ এ যুগেও ব্যক্তিগত -বিরোধিতা রয়েছে দেওয়াল-প্রচারে। যেমন—, “অনুন্নয়ন ঘরে ঘরে/ মমতার বিদায় ভবানীপুরে”। বা, “বলছে এবার বেলেঘাটা/তোলামূল প্রার্থী জেলখাটা”। প্রার্থী-ঘোষণার পরদিনই রাজ্যের সদ্য-প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ রায় রঙ-তুলি দিয়ে দেওয়ালে লিখলেন— “যতই করো হামালা/জিতবে এবার বাংলা’’।


Recent Comments