রাজ্য রাজনীতিতে তিনি বরাবরই স্পষ্টবক্তা এবং লড়াকু নেতা হিসেবে পরিচিত। তাঁর মন্তব্য নিয়ে বারবার রাজ্যজুড়ে তৈরি হয় রাজনৈতিক বিতর্ক এবং জল্পনা। এবার নিজের পুরনো গড় খড়্গপুর (Kharagpur) গিয়ে দলেরই একাংশের বিরুদ্ধে রীতিমতো বোমা ফাটালেন বিজেপির (BJP) প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh)। দলের ভেতরে যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বা অন্তর্কলহ রয়েছে, তা কার্যত নিজের মুখেই প্রকাশ্য জনসভায় স্বীকার করে নিলেন এই দাপুটে নেতা। শুধু তাই নয়, যারা দলের ভেতরে থেকে দলেরই ক্ষতি করতে চাইছেন বা তাঁকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন, তাদের কড়া ভাষায় বার্তা দিয়ে তিনি ছুঁড়ে দিয়েছেন এক লক্ষ ভোটে জেতার বিশাল চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) রাজ্য রাজনীতিতে কান পাতলে গেরুয়া শিবিরের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কথা শোনা যায়। বিশেষ করে মেদিনীপুর (Medinipur) এবং সংলগ্ন এলাকায় আদি এবং নব্য নেতাদের মধ্যে মন কষাকষি নতুন কোনও ঘটনা নয়। কিন্তু এবার যেভাবে প্রকাশ্য কর্মসূচিতে এসে দিলীপবাবু নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন, তাতে রাজনৈতিক মহলে রীতিমতো চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, দলের বাইরের শত্রুদের চেয়েও দলের ভেতরের একাংশ অনেক বেশি ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ, খড়্গপুরে এখন গেরুয়া শিবিরের লড়াই প্রধান প্রতিপক্ষ তৃণমূলের (Trinamool) পাশাপাশি নিজেদের দলের নেতাদের একাংশের বিরুদ্ধেও! খোদ প্রাক্তন রাজ্য সভাপতির মুখে এমন কথা দলের অস্বস্তি যে অনেকটাই বাড়িয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এদিন দলীয় কর্মীদের সঙ্গে জনসংযোগের সময় নিজের পুরনো মেজাজেই ধরা দেন দিলীপ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, তাঁকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চক্রান্ত দলের ভেতর থেকেই হচ্ছে। তবে তিনি এই সব ছোটখাটো চক্রান্তকে একেবারেই পাত্তা দিতে নারাজ। অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি দাবি করেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে কে কী করল, তাতে তাঁর কিছু যায় আসে না। সাধারণ মানুষ এখনও তাঁর সঙ্গে রয়েছেন। তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলেন, যদি তিনি নির্বাচনে দাঁড়ান, তবে এক লক্ষেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জিতবেন। তাঁর এই ‘১ লাখ’ ভোটের চ্যালেঞ্জ মূলত দলের ভেতরের সেই সব নেতাদের প্রতিই চরম বার্তা, যারা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিলেন।
খড়্গপুর শহর দিলীপ ঘোষের কাছে বরাবরই একটি আবেগ এবং রাজনৈতিক শক্তির ভরকেন্দ্র। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই প্রথমবার বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হয়ে রাজ্য রাজনীতিতে চমক দিয়েছিলেন তিনি। এরপর লোকসভা নির্বাচনেও এই এলাকার মানুষ তাঁকে দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দলের সাংগঠনিক রদবদল এবং নতুন কিছু নেতার উত্থানের ফলে পুরনো এবং পরীক্ষিত নেতাদের গুরুত্ব কমানোর একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভারত (India) জুড়ে যখন শীর্ষ নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের বার্তা দিচ্ছেন, তখন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এই প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কপালেও চিন্তার ভাঁজ ফেলতে বাধ্য।
খড়্গপুর সদরের মতো একটি চর্চিত আসনে এই অন্তর্কলহ দলের নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। যে সাধারণ কর্মীরা দিনরাত এক করে দলের পতাকা বয়ে বেড়াচ্ছেন, তারা নেতাদের এমন প্রকাশ্য কাদা ছোঁড়াছুড়িতে স্বভাবতই হতাশ। দিলীপ অনুগামীরা মনে করেন, বিগত কয়েক বছরে রাজ্যে দলের সংগঠনকে শক্তিশালী করার পেছনে তাঁর যে অক্লান্ত পরিশ্রম রয়েছে, তা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। অথচ দলেরই কিছু স্বার্থান্বেষী নেতা নিজেদের পদ এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে তাঁর মতো একজন জননেতাকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করছেন।


Recent Comments