ভারতের (India) মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলগুলোর আয়-ব্যয়ের খতিয়ান নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। সেই কৌতূহলের নিরসন ঘটিয়ে একটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট প্রকাশ করল নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (Association for Democratic Reforms) বা এডিআর (ADR)। তাদের সদ্য প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে দেশের ছ’টি প্রধান জাতীয় দলের মোট আয়ের সিংহভাগ, অর্থাৎ প্রায় ৮৫ শতাংশই ঢুকেছে শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party) বা বিজেপি (BJP)-র তহবিলে। অন্যান্য দলগুলো আর্থিক নিরিখে তাদের চেয়ে বহুগুণ পিছিয়ে রয়েছে।
আয়ের খতিয়ানে বিপুল ব্যবধান
দেশের নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর জমা দেওয়া বার্ষিক অডিট রিপোর্টের ভিত্তিতে এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছে এডিআর। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে দেশের ছ’টি প্রধান জাতীয় দল— বিজেপি, জাতীয় কংগ্রেস (Indian National Congress), সিপিএম (CPI(M)), আম আদমি পার্টি (Aam Aadmi Party) বা আপ (AAP), বহুজন সমাজ পার্টি (Bahujan Samaj Party) বা বিএসপি (BSP) এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (National People’s Party) বা এনপিইপি (NPEP) মিলিয়ে মোট ৭,৯৬০.০৯ কোটি টাকা আয় করেছে।
এর মধ্যে শুধুমাত্র শাসক দল বিজেপির আয় হয়েছে ৬,৭৬৯.১৪ কোটি টাকা, যা জাতীয় দলগুলোর মোট আয়ের ৮৫.০৩ শতাংশ। আয়ের নিরিখে দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপির আর্থিক ব্যবধান আকাশপাতাল। দেশের প্রধান বিরোধী দলের মোট আয় ৯১৮.২৮ কোটি টাকা, যা মোট হিসেবের মাত্র ১১.৫৩ শতাংশ।
অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে সিপিএম-এর আয় ১৭২.৬০ কোটি টাকা, বিএসপির আয় ৫৮.৫৮ কোটি টাকা, আপের আয় ৩৯.২৮ কোটি টাকা এবং মেঘালয়ের (Meghalaya) মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমার (Conrad Sangma) দল এনপিইপি-র আয় মাত্র ২.১৮ কোটি টাকা।
আয়ের প্রধান উৎস: চাঁদা ও অনুদান
রাজনৈতিক দলগুলোর এই বিপুল অর্থের উৎস কী? এডিআর-এর রিপোর্ট বলছে, এই ছ’টি দলের মোট আয়ের ৮৫.০৮ শতাংশ বা ৬,৭৭২.৫৩ কোটি টাকাই এসেছে বিভিন্ন অনুদান বা চাঁদা থেকে। বাকি অর্থ এসেছে অন্যান্য উৎস থেকে।
বিজেপির মোট আয়ের ৯০.৪৮ শতাংশই (প্রায় ৬,১২৪.৮৫ কোটি টাকা) এসেছে শুধুমাত্র অনুদান থেকে। অন্যদিকে, আপ এবং এনপিইপি-র আয়ের প্রায় ৯৯ শতাংশেরও বেশি এসেছে চাঁদা মারফত। কংগ্রেস তাদের আয়ের ৫৬.৮৬ শতাংশ (৫২২.১৩ কোটি টাকা) পেয়েছে অনুদান থেকে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, উত্তরপ্রদেশের (Uttar Pradesh) নেত্রী মায়াবতীর (Mayawati) দল বিএসপি জানিয়েছে যে তাদের আয়ের ১০০ শতাংশই অন্যান্য উৎস থেকে এসেছে, তারা কোনও চাঁদা পায়নি।
আয়ের তুলনায় ব্যয়ের চিত্র
আয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যয়ের হিসেবও সামনে এনেছে এডিআর। আয়ের নিরিখে সবার উপরে থাকলেও, খরচের ক্ষেত্রে বেশ হিসেবি মনোভাব দেখিয়েছে পদ্মশিবির। বিজেপি তাদের মোট আয়ের মাত্র ৫৫.৭৬ শতাংশ বা ৩,৭৭৪.৫৮ কোটি টাকা খরচ করেছে।
অন্যদিকে, কংগ্রেস তাদের আয়ের তুলনায় অনেক বেশি টাকা খরচ করে ফেলেছে। তারা মোট ১,১১১.৯৪ কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যা তাদের মোট আয়ের থেকে ২১.০৯ শতাংশ বেশি। একই অবস্থা বিএসপিরও। তাদের আয় ছিল ৫৮.৫৮ কোটি টাকা, কিন্তু তারা খরচ করেছে ১০৬.৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, আয়ের চেয়ে তাদের ব্যয় ৮১.৪৫ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি, অরবিন্দ কেজরিওয়ালের (Arvind Kejriwal) দল আপ তাদের আয়ের প্রায় ৯২.৮৩ শতাংশই খরচ করে ফেলেছে।
এক বছরে কার আয় কতটা বাড়ল?
গত আর্থিক বছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪-এর তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর আয়ের একটি তুলনামূলক চিত্রও তুলে ধরেছে সংস্থাটি। এই এক বছরে বিজেপির আয় অভাবনীয়ভাবে ৫৫.৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আপের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে ৭৩.২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সিপিএমের আয় সামান্য অর্থাৎ ২.৯৬ শতাংশ বেড়েছে।
বিপরীত চিত্র দেখা গিয়েছে কংগ্রেস এবং বিএসপির ক্ষেত্রে। গত বছরের তুলনায় কংগ্রেসের আয় ২৫.০৫ শতাংশ কমেছে এবং বিএসপির আয়ও ৯.৫৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে (Democratic Structure) একটি নির্দিষ্ট দলের হাতে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ কেন্দ্রীভূত হওয়া আগামী দিনে নির্বাচনী লড়াইকে কতটা একতরফা করে তুলবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
