দেশের জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার সরকারি প্রোটোকল বা নিয়মবিধি নিয়ে সম্প্রতি একটি নির্দেশিকা জারি করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার (Central Government)। সেই নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের হওয়া একটি জনস্বার্থ মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই এবার প্রশ্ন তুলে দিল খোদ আদালত। বৃহস্পতিবার এই মামলার শুনানিকালে প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল (Chief Justice Sujoy Paul) এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের (Justice Partha Sarathi Sen) ডিভিশন বেঞ্চ মামলাকারীকে তাঁর অভিযোগের সপক্ষে যৌক্তিক এবং ঐতিহাসিক প্রমাণ পেশ করার নির্দেশ দিয়েছে।
কেন্দ্রের বিতর্কিত নির্দেশিকা এবং মামলা
আদালত সূত্রে খবর, চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে দেশের সমস্ত রাজ্যের মুখ্য সচিবদের কাছে একটি নির্দেশিকা পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয় যে, রাজ্যের যে কোনও বড় বা গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’-এর সম্পূর্ণ সরকারি সংস্করণটি গাইতে বা বাজাতে হবে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত এই মূল গানের ছ’টি স্তবক রয়েছে এবং এটি সম্পূর্ণ গাইতে প্রায় ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ড সময় লাগে। কেন্দ্রের এই নির্দেশিকাকে চ্যালেঞ্জ করেই হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন এক মামলাকারী।
শুনানিতে জোরদার সওয়াল-জবাব
বৃহস্পতিবার বিকেলে মামলাটি শুনানির জন্য উঠলে, প্রথমেই এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আপত্তি তোলেন কেন্দ্রের হয়ে সওয়াল করা অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল অশোক চক্রবর্তী (Additional Solicitor General Ashoke Chakraborty)। তিনি আদালতে যুক্তি দেন যে, এই জনস্বার্থ মামলাটি সম্পূর্ণভাবে মামলাকারীর ব্যক্তিগত স্বার্থে করা হয়েছে, এখানে কোনও বৃহত্তর জনস্বার্থ জড়িত নেই।
অশোক চক্রবর্তী বলেন, “দেশের জাতীয় স্তোত্রের সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলি জড়িত। এই ধরনের বিষয় কি সত্যিই আদালতের বিচার্য হতে পারে? মামলাকারীকে প্রথমে এই জনস্বার্থ মামলার আসল ভিত্তি প্রমাণ করতে হবে। তা না করতে পারলে তাঁর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক জরিমানার নির্দেশ দেওয়া উচিত।”
রবীন্দ্রনাথ ও নেহেরুর প্রসঙ্গ টানলেন মামলাকারী
মামলাকারীর হয়ে এদিন আদালতে সওয়াল করেন বর্ষীয়ান আইনজীবী এবং সিপিএম (CPI-M) সাংসদ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য (Bikas Ranjan Bhattacharya)। তিনি তাঁর যুক্তিতে ইতিহাসের পাতা উল্টে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) এবং দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর (Jawaharlal Nehru) প্রসঙ্গ টেনে আনেন।
বিকাশবাবু আদালতে বলেন, “১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শ মেনে জওহরলাল নেহেরু এই গানের কিছু অংশকে সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে সেই অংশটিকেই জাতীয় স্তোত্রের মর্যাদা দেওয়া হয়। গোটা গানের মাত্র দুটি স্তবককেই জাতীয় স্তোত্র হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল।”
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি আরও বলেন, “সেই সময় যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, বাকি স্তবকগুলোতে ব্যবহৃত শব্দগুলো দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিপন্থী হতে পারে। সেই কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওই অংশগুলো বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে ভারতের গণপরিষদ বা কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি (Constituent Assembly) সেই প্রস্তাবটিকেই সংবিধানে গ্রহণ করেছিল।”
আদালতের নির্দেশ ও পরবর্তী পদক্ষেপ
দু’পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ নির্দেশ দেয় যে, মামলাকারী যে ঐতিহাসিক আখ্যান বা বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে এই জনস্বার্থ মামলাটি দায়ের করেছেন, তার সপক্ষে উপযুক্ত এবং যৌক্তিক প্রমাণ আদালতের সামনে পেশ করতে হবে।
এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ২৩ মার্চ। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ওই নির্দিষ্ট দিনের মধ্যেই মামলাকারীর আইনজীবীকে তাঁদের দাবির সমর্থনে সমস্ত প্রাসঙ্গিক প্রমাণ ও নথি জমা করতে হবে। এখন দেখার, ২৩ মার্চ মামলাকারী তাঁর দাবির সপক্ষে কী প্রমাণ পেশ করেন এবং আদালত এই স্পর্শকাতর বিষয়ে কী রায় দেয়।
