আসন্ন নির্বাচনের আগে ফের একবার রাজপথে নামতে চলেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Chief Minister Mamata Banerjee)। নির্বাচন কমিশন (Election Commission) কর্তৃক সাম্প্রতিক স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (Special Intensive Revision) বা এসআইআর-এর (SIR) পর ভোটার তালিকা থেকে গণহারে নাম বাদ পড়ার প্রতিবাদে আজ, শুক্রবার তিনি ধর্নায় বসবেন। কাকতালীয়ভাবে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যে আসতে চলেছে কমিশনের ফুল বেঞ্চ, যারা রাজ্যের নির্বাচন প্রস্তুতির চূড়ান্ত খতিয়ান নেবে। ঠিক তার আগেই মুখ্যমন্ত্রীর এই প্রতিবাদী কর্মসূচি রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন উত্তাপের সৃষ্টি করেছে।
কলকাতা (Kolkata)-র কেন্দ্রস্থল ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেল (Metro Channel) আজ এই ঐতিহাসিক প্রতিবাদের সাক্ষী হতে চলেছে। জানা গিয়েছে, এই ধর্না মঞ্চের প্রস্তুতি দু’দিন আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সকালেই পূর্ত দফতরের আধিকারিক এবং পুলিশ প্রশাসন স্নিফার ডগ নিয়ে মঞ্চ ও সংলগ্ন এলাকা কড়া নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলার ব্যবস্থা করেছে। বেলা ১১টা থেকে জমায়েত শুরু হলেও মূল ধর্না কর্মসূচি শুরু হবে দুপুর ২টো থেকে। রাস্তার ডিভাইডারের রেলিংগুলিও নীল-সাদা রঙে রাঙানো হয়েছে কর্মীদের উদ্যোগে।
তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) গত রবিবারই এই ধর্নার কথা প্রথম ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করছে কমিশন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, দল কোনোভাবেই এই এসআইআর-কে সমর্থন করে না এবং নেত্রী ধর্নামঞ্চ থেকেই পরবর্তী রূপরেখা ঘোষণা করবেন।
মমতার এই রাজপথে ফেরা রাজনৈতিক মহলে গভীর নস্টালজিয়ার জন্ম দিয়েছে, কারণ তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বহু স্মৃতি এই রাস্তার সঙ্গে জড়িয়ে। ২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে এই মেট্রো চ্যানেলই ছিল বামফ্রন্ট (Left Front) সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান মঞ্চ। রাজ্যবাসীর আজও মনে আছে ২০০৬ সালের ৪ ডিসেম্বরের সেই ঐতিহাসিক দিনের কথা, যখন টাটা মোটরস (Tata Motors)-এর ছোট গাড়ি প্রকল্পের জন্য সিঙ্গুর (Singur)-এ জোরজুলুম করে জমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে তিনি টানা ২৬ দিন অনশন করেছিলেন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সেই আন্দোলনই রাজ্যে ৩৪ বছরের বাম শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করেছিল। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি একাধিকবার ধর্নায় বসেছেন। যেমন, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কলকাতা পুলিশের তৎকালীন কমিশনারকে সিবিআই (CBI) জেরা করতে চাওয়ার প্রতিবাদে তিনি ধর্নায় বসেন, কিংবা ২০২৪ সালে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা ও রাজ্যের প্রাপ্য তহবিল আটকে রাখার প্রতিবাদে রেড রোড (Red Road)-এও সরব হন তিনি।
ধর্না শুরুর একদিন আগে থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা এসে ভিড় জমাতে শুরু করেছেন। মুর্শিদাবাদ (Murshidabad) থেকে আসা তৃণমূল কর্মী জাকির কারিকর (Zakir Karikar), যিনি সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় থেকেই দলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত, তিনি বৃহস্পতিবারই ধর্না মঞ্চের প্রস্তুতি দেখতে চলে এসেছেন। তিনি বলেন, “আমি দিদির অনশনের দিন থেকেই এই সংগ্রামের সঙ্গী। সেবার লড়াই ছিল কৃষকদের জমি বাঁচানোর। কিন্তু এবারের ইস্যুটা আরও বড়, কারণ রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়-সহ বহু সাধারণ মানুষ আজ ভিত্তিহীনভাবে ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় ভুগছেন।”
একই সুর শোনা গেল ১৯৯৮ সাল থেকে দলের বুথ লেভেল এজেন্ট হিসেবে কাজ করা সঞ্জয় চক্রবর্তী (Sanjay Chakraborty)-র গলায়। তাঁর কথায়, “এটা সিঙ্গুরের পর মানবাধিকার রক্ষার দ্বিতীয় বড় আন্দোলন। আমি নিজের চোখে দেখছি কীভাবে সাধারণ ভোটারদের নাম তালিকা থেকে অকারণে বাদ দেওয়া হচ্ছে বা সংশয়জনক তালিকায় রাখা হচ্ছে। আমরা চাই কমিশন এই সিদ্ধান্তগুলো অবিলম্বে খতিয়ে দেখুক।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এপ্রিল মাসের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাতিলের এই ইস্যুটিকেই তৃণমূল কংগ্রেস তাদের প্রধান হাতিয়ার করতে চাইছে।
