রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ ক্রমশ চড়ছে পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) রাজ্যের রাজনীতিতে। বিশেষ করে আসন্ন পঞ্চায়েত ও স্থানীয় নির্বাচনগুলোর আগে প্রতিটি রাজনৈতিক দল নিজেদের ঘর গোছাতে চূড়ান্ত ব্যস্ত। কিন্তু এরই মাঝে দলীয় কোন্দল এবং অন্তর্দ্বন্দ্ব যেন পিছু ছাড়তে চাইছে না বাম শিবিরের। এবার খাস কালীগঞ্জ (Kaliganj) এলাকায় সিপিএম (CPM) বা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) -র অন্দরে বড়সড় ফাটল একেবারে প্রকাশ্যে চলে এল। শুধু প্রকাশ্যে আসাই নয়, পরিস্থিতি এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ক্ষোভে ফেটে পড়ে নিজেদের দলীয় কার্যালয়েই ব্যাপক ভাঙচুর চালান খোদ দলের একাংশের বিক্ষুব্ধ কর্মীরা। আর এই চূড়ান্ত শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে এবার চরম কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করল দলের উচ্চ নেতৃত্ব। এক ধাক্কায় দল থেকে বহিষ্কার করা হল সাত জন নেতা-কর্মীকে।
কেন এই ক্ষোভ? কী ঘটেছিল কালীগঞ্জে?
পুরো ঘটনার সূত্রপাত একটি নির্দিষ্ট প্রার্থীপদ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, দলের তরফ থেকে তমন্না (Tamanna) নামের এক পরিচিত এবং সক্রিয় কর্মীর মাকে আসন্ন নির্বাচনের জন্য প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়। আর দলের এই সিদ্ধান্ত ঘিরেই শুরু হয় তুমুল বিতর্ক ও অশান্তি।
দলের নিচুতলার একাংশের মতে, যাঁকে প্রার্থী হিসেবে টিকিট দেওয়া হয়েছে, তাঁর সেভাবে কোনও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বা শক্ত জনভিত্তি নেই। এলাকায় বহু পুরোনো এবং ত্যাগী নেতা-কর্মী রয়েছেন, যাঁরা বছরের পর বছর দলের দুর্দিনে মাঠে নেমে লড়াই করেছেন। তাঁদের সম্পূর্ণ ব্রাত্য রেখে কেন আচমকা একজন আনকোরা মুখকে টিকিট দেওয়া হল, তা নিয়েই ক্ষোভে ফেটে পড়েন ওই কর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে স্বজনপোষণ এবং স্থানীয় নেতৃত্বের একাংশের ব্যক্তিগত স্বার্থ কাজ করেছে।
দলীয় কার্যালয়ে তাণ্ডব
এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের আঁচ গিয়ে পড়ে সোজা কালীগঞ্জের প্রধান জোনাল দলীয় কার্যালয়ে। ক্ষুব্ধ কর্মীরা সকাল থেকেই জড়ো হয়ে অফিসের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। অভিযোগ, পরিস্থিতি একসময় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। স্লোগান দিতে দিতে বিক্ষুব্ধরা আচমকাই কার্যালয়ের মূল গেট ভেঙে ভিতরে ঢুকে পড়েন এবং ব্যাপক ভাঙচুর চালান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, দলের অফিসের চেয়ার, টেবিল, ফ্যান ভাঙচুর করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ দলীয় নথিপত্র এবং ব্যানারও তছনছ করে দেওয়া হয়। এই অভাবনীয় তাণ্ডবের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায়। খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ছুটে আসে পুলিশ। ঘটনার খবর দ্রুত পৌঁছে যায় জেলা ও রাজ্য সদর দফতর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে।
কড়া পদক্ষেপ ও ৭ জন বহিষ্কার
সিপিএম বরাবরই নিজেদের একটি ক্যাডারভিত্তিক এবং চরম শৃঙ্খলাপরায়ণ দল হিসেবে দাবি করে এসেছে। সেখানে খোদ দলের কার্যালয়ে এমন তাণ্ডব কোনোভাবেই বরদাস্ত করতে রাজি নয় নেতৃত্ব। ঘটনার পরেই তড়িঘড়ি জরুরি ভিত্তিতে লোকাল ও এরিয়া কমিটির বৈঠক ডাকা হয়। ওই বৈঠকেই ভাঙচুরের ঘটনার তীব্র নিন্দা করা হয় এবং অভিযুক্তদের দ্রুত চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়।
দলীয় সূত্রে খবর, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানের ভিত্তিতে মোট সাত জনকে এই তাণ্ডবের মূল পাণ্ডা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপরই দলের গঠনতন্ত্র এবং সংবিধান অনুযায়ী শৃঙ্খলাভঙ্গের গুরুতর অভিযোগে ওই সাত জনকে দল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বহিষ্কার করার কথা ঘোষণা করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ জেলা নেতা নিউজস্কোপ বাংলাকে জানিয়েছেন, “দলের মধ্যে প্রার্থী নিয়ে মতানৈক্য থাকতেই পারে। গণতান্ত্রিক উপায়ে আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান করা উচিত। কিন্তু তাই বলে দলের আস্থার প্রতীকে, অর্থাৎ পার্টি অফিসে হামলা চালানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দলবিরোধী কাজের জন্য কড়া বার্তা দিতেই এই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিতে আমরা বাধ্য হয়েছি।”
বিরোধীদের কটাক্ষ ও বর্তমান পরিস্থিতি
এই ঘটনার পর স্বভাবতই রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে আসরে নেমেছে এলাকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। শাসক দলের এক স্থানীয় নেতা কটাক্ষ করে বলেন, “বামেদের এখন পায়ের তলায় মাটি নেই। মানুষের সমর্থন হারিয়ে ওরা এখন নিজেদের মধ্যেই মারামারি করে মরছে।” যদিও এই কটাক্ষকে একেবারেই আমল দিতে নারাজ বাম নেতৃত্ব। তাঁদের পালটা দাবি, দলে আগাছা জন্মালে তা ছেঁটে ফেলাই নিয়ম। এতে দল আগামী দিনে আরও শক্তিশালী এবং ঐক্যবদ্ধ হবে।
কালীগঞ্জে কড়া সিপিএম: তমন্নার মাকে প্রার্থী করায় দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর, ৭ জনকে বহিষ্কার
RELATED ARTICLES


Recent Comments