অশোক সেনগুপ্ত
আপাততঃ পরিবারগঠনার্থে বংশের উপযুক্ত বিস্তারের এবং ভারতীয় সমাজের মঙ্গলার্থে সঙ্ঘপ্রধানের তিন সন্তানের তত্ত্ব ‘আবশ্যক’ বলে মন্তব্য করলেন গবেষক, প্রাবন্ধিক ও বিশ্লেষক দেবযানী ভট্টাচার্য্য। “হিন্দু দম্পতিদের তিন সন্তান নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আরএসএস (RSS) প্রধান মোহন ভাগবত (Mohan Madhukar Bhagwat)। তার প্রেক্ষিতে বুধবার এই মন্তব্য করেন দেবযানী।
সঙ্ঘপ্রধানের দাবি, “বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, তিনটির কম সন্তান হলে বংশবিস্তারের গতি কমে যায়। এর ফলে সেই পরিবার তথা কোনও সম্প্রদায় ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।” মঙ্গলবার লখনউয়ের এক সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন।
দেবযানী এই প্রসঙ্গে এই প্রতিবেদককে জানান, “সাম্প্রতিক অতীতে সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবতকে একাধিক বক্তৃতায় বলতে শোনা গিয়েছে যে ভারতীয় হিন্দু সমাজে দম্পতি পিছু সন্তান সংখ্যা হওয়া উচিত তিন। এ হেন বক্তব্য সঙ্ঘপ্রধানের তরফ থেকে এলে ভ্রূকুঞ্চিত হয় বেশ কিছু মানুষের। নানাপ্রকার উপভোগ্য তির্যক মন্তব্য শুনতে পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক অতীতে কলকাতার সায়েন্স সিটি অডিটোরিয়ামে (Science City Auditorium) ভাগবত যখন বিষয়টির উপস্থাপনা করেন, তখন তাঁর যৌক্তিক বক্তব্যের হাস্যরসাত্মক উপস্থাপনা সাদরে
গৃহীত হয়েছিল।”
কলকাতার সভায় তাঁর কাছে রাখা একটি প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে তিনি বক্তব্য রাখেন। একথাও বলেন যে অকৃতদার পুরুষ হিসেবে এ বিষয়ে বক্তব্য রাখার জন্য উপযুক্ত তিনি নন। দেশের গড় জন্মহারের প্রতিস্থাপনের হার (replacement rate)২.১ বলেই সরসঙ্ঘচালক বলেন, দেশের জনবিন্যাসের ভারসাম্যকে অটুট রাখতে হলে দম্পতি পিছু সন্তান সংখ্যা এই হার-এর উপরে হওয়া আবশ্যক।
যুক্তি দেখাতে গিয়ে তিনি বলেন, জনবিন্যাসের ভারসাম্য পরিবর্তিত হলেই দেশের অভ্যন্তরে তৈরি হয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জটিলতা। এই হার যেহেতু ২.১। সন্তান সংখ্যা যেহেতু ভগ্নাংশে হতে পারে না ফলে দম্পতি পিছু সন্তান সংখ্যা ২.১-এর বেশি করতে গেলে ন্যূনতম তিন হওয়া অঙ্কের হিসাবেই আবশ্যক।
তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে ভগ্নাংশে সন্তান হওয়ার বিষয়টি নিয়ে অডিটরিয়ামের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল বেশ একখানি কৌতুকাবহ পরিবেশ। অকাট্য যুক্তি ও হাস্যরসাত্মক উপস্থাপনাই ছিল এ হেন বিষয়ে তাঁর বক্তৃতার বৈশিষ্ট্য।”
দেবযানী বলেন, “সাম্প্রতিক কেন্দ্রীয় বাজেটের পূর্বে ২০২৫-২৬ অর্থ বর্ষের অর্থব্যবস্থা সমীক্ষার যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, সে রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৩ সালে ভারতের গড় জন্মহার প্রতিস্থাপন হারের নীচে নেমে গিয়ে হয়েছে ১.৯। যেখানে পশ্চিমবঙ্গে এই হার মাত্র ১.৩ এবং বিহারে তা ২.৮।
এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, কলকাতার বক্তৃতায় সরসঙ্ঘচালকও বলেছিলেন যে বিহারের হার যদি বাকি রাজ্যগুলির মত হত, তবে ভারতের হার ১.৯-এরও নীচে নামত।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে জন্মহারের এ হেন পতন ভারতীয় সমাজের সামগ্রিক ভাবধারা ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই পরিবর্তন করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সরসঙ্ঘচালকের বক্তব্য শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, বংশবিস্তারই প্রাণী জন্মের জীববৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য এবং মানবজাতি (Homo sapiens) বিশ্বের প্রাণীকুলের অন্যতম এক প্রাণী প্রজাতি ভিন্ন নয়।
তৎসত্ত্বেও, বংশবিস্তার কর্মে এ হেন অনীহা আদতে একপ্রকার জীবন ও প্রাণীধর্মবিমুখতা। ‘মানুষ’ হয়ে উঠতে গিয়ে যদি মৌলিক ‘প্রাণী’ পরিচয়কে অস্বীকার করতে হয়, তবে সভ্যতা ও শিক্ষার তদধিক ব্যর্থতা অন্য কিছু হতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহিলা ও পুরুষেরা করেছেন জীবনের এ হেন সারমর্মের উপযুক্ত উপলব্ধি, ফলে মার্কিনী দম্পতিরা আজকাল গ্রহন করছেন তিন, চার বা ততোধিক সন্তান।
জীবনের সার্থকতা যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস, সুখ-দুঃখ, শান্তি-অশান্তি ও সমস্যা-সমাধানপূর্ণ প্রাণচঞ্চল একটি পরিবারের অংশ হওয়ার মধ্যেই, পাশ্চাত্য সমাজ তা উপলব্ধি করেছে ইতিমধ্যেই। ‘দ্য মডার্ণ ফ্যামিলি’র মত আমেরিকান টেলিভিশন শো’ও মার্কিন সমাজের এ হেন উপলব্ধির পরোক্ষ নির্দেশক।
অন্যদিকে ভারতীয়রা চিরায়তকাল যাবৎ সে হেন পরিবার ও সমাজবোধে ঋদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কালের কুটিল গতিতে কেমন করে আজ হারিয়ে ফেলল সে বোধ, সে প্রসঙ্গ পৃথক।
ভারতীয় পরিবারব্যবস্থা থেকে শিক্ষা গ্রহন করে পাশ্চাত্য যদি সঠিক দিশায় পা বাড়াতে পারে, ভারতবর্ষ তবে নিজ ঐতিহ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকবে কেন? ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত দেশের স্বীকৃতি পাওয়ার লক্ষ্য স্থির করেছে যে ভারতবর্ষ, সে দেশের মাথাপিছু আয়ও নিশ্চিতভাবেই এমন হওয়া আবশ্যক যাতে আর্থিক অনটনের উপলব্ধি ন্যূনতম তিন সন্তান গ্রহন করার পথে ভারতীয়দের জন্য অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়।”

