২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন একেবারে শিয়রে। রাজ্যের সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ঘুঁটি সাজাতে চূড়ান্ত ব্যস্ত। ঠিক এই রকম এক উত্তেজনাময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (All India Trinamool Congress) বা তৃণমূলের অন্দরে এবং রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হলো। আসন্ন নির্বাচনে হুগলী (Hooghly) জেলার গোঘাট (Goghat) বিধানসভা কেন্দ্র থেকে শাসক দলের প্রার্থী হিসেবে ডাঃ নির্মল মাজি (Dr. Nirmal Maji)-র নাম ঘোষণা হওয়ার পরেই তাঁর প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের জন্য জোরালো দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং চিকিৎসার গাফিলতির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে আসা অন্যতম প্রধান স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পিপল ফর বেটার ট্রিটমেন্ট (People for Better Treatment) বা পিবিটি-র সভাপতি ডাঃ কুণাল সাহা (Dr. Kunal Saha) সরাসরি তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব তথা চেয়ারপার্সনকে একটি জরুরি চিঠি পাঠিয়েছেন। ২০শে মার্চ, ২০২৬ তারিখে পাঠানো এই চিঠিতে তিনি চিকিৎসায় গাফিলতির শিকার হওয়া অসংখ্য সাধারণ মানুষ এবং তাঁদের পরিবারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাষায় দাবি জানিয়েছেন যে, অবিলম্বে গোঘাট কেন্দ্র থেকে নির্মলবাবুর মনোনয়ন বাতিল করতে হবে এবং তাঁর জায়গায় একজন স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মানুষকে প্রার্থী করতে হবে।
কিন্তু কেন এই আকস্মিক বিরোধিতা? চিঠিতে উল্লেখিত আইনি নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal)-এর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একসময়ের প্রভাবশালী এই নেতার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক গুরুতর অপরাধমূলক অভিযোগ। ২০২২ সালে তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি তহবিল তছরুপের মতো মারাত্মক অভিযোগ ওঠে। সেই সময় তিনি ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিকেল কাউন্সিল (West Bengal Medical Council) বা ডব্লিউবিএমসি-র সভাপতি পদে আসীন ছিলেন। একজন জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি পদে থেকে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তহবিল আত্মসাতের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ৪০৯ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি এই মামলায় জামিনে মুক্ত রয়েছেন এবং তাঁর বিচার প্রক্রিয়া এখনও বিচারাধীন।
পিবিটি-র পক্ষ থেকে তৃণমূল নেতৃত্বকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই মামলার আইনি জটিলতা অনেকটাই গভীর। শুরুতে বিধাননগর (Bidhannagar) এসিজেএম আদালতে এই মামলার (সি. কেস নম্বর ২০২২/২০২২) সূত্রপাত হয়েছিল। পরে জনপ্রতিনিধিদের মামলা হওয়ার কারণে তা স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাত (Barasat)-এর এমপি এবং বিধায়কদের জন্য গঠিত বিশেষ আদালতে (Special Court) এই মামলার আইনি প্রক্রিয়া চলছে। স্পেশাল কেস নম্বর ৭২/২০২২-এর উল্লেখ করে ডাঃ সাহা জানিয়েছেন যে, ২০২৩ সালের ১লা এপ্রিল বিশেষ আদালতের বিচারক ভবানী শঙ্কর শর্মা একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশে ৪০৯ ধারার বিচার ঠিক কোন আদালতে হবে—এমপি/বিধায়কদের বিশেষ আদালতে নাকি ৪০৯ ধারার জন্য নির্দিষ্ট বিশেষ আদালতে, সেই জুরিসডিকশন বা এক্তিয়ার সংক্রান্ত প্রশ্নের সমাধানের জন্য মামলাটি কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)-এর কাছে রেফার করা হয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ডাঃ সাহা তাঁর আবেদনে অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, রাজ্যের সাধারণ মানুষ আগামী দিনে একটি সৎ, কার্যকরী এবং দুর্নীতিমুক্ত সরকার গড়তে ভোট দেবেন। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে একজন কলঙ্কিত এবং দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাকে যদি শাসক দল টিকিট দেয়, তবে তা সাধারণ ভোটারদের কাছে অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা পাঠাবে। শুধু গোগাটের ভোটাররাই নন, সমগ্র রাজ্যের মানুষের কাছেই এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন ঘাসফুল শিবিরের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী দলগুলো যখন প্রতিনিয়ত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে শাসক শিবিরকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে, তখন এরকম একজন আইনি গ্যাঁড়াকলে আটকে থাকা নেতাকে প্রার্থী করা দলের জন্য কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়ে দলের অভ্যন্তরেও চর্চা শুরু হয়েছে। পিবিটি-র এই চিঠি সেই আগুনে কার্যত ঘি ঢেলে দিল।
চিঠির শেষে বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষ তাঁদের জনপ্রতিনিধিদের কাছে এক স্বচ্ছ এবং নিষ্কলুষ চরিত্রের প্রত্যাশা করে। বিতর্কিত অতীত থাকা কোনো ব্যক্তির হাত ধরে সেই প্রত্যাশা পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। তাই অবিলম্বে তাঁকে সরিয়ে যোগ্য ও সৎ কাউকে টিকিট দিলে তা দলের ভাবমূর্তিকেই কেবল উজ্জ্বল করবে না, বরং রাজ্যে একটি ইতিবাচক বার্তাও দেবে। এখন দেখার বিষয়, শাসক দল এই আবেদনের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

Recent Comments