আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে। এই আবহে ভোট প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অবাধ, শান্তিপূর্ণ এবং প্রলোভনমুক্ত করতে এক ঐতিহাসিক এবং কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করল জাতীয় নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India)। সম্প্রতি এক বিশেষ বার্তার মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, ৫টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের জন্য ২৫ লক্ষেরও বেশি নির্বাচন আধিকারিক এবং কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
গত ১৫ মার্চ, ২০২৬ তারিখে নির্বাচন কমিশন আসাম (Assam), কেরালা (Kerala), পুদুচেরি (Puducherry), তামিলনাড়ু (Tamil Nadu) এবং পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal)-এর বিধানসভা নির্বাচন সহ দেশের আরও ৬টি রাজ্যের উপনির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশ করেছে। এই নির্বাচনগুলিতে যাতে কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, হিংসার পরিবেশ তৈরি না হয় এবং সাধারণ ভোটাররা যাতে সম্পূর্ণ নির্ভয়ে নিজেদের গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, প্রধানত সেই কারণেই এই বিপুল সংখ্যক বাহিনী ও কর্মী মোতায়েন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কমিশনের দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই রাজ্যগুলিতে বর্তমানে মোট যোগ্য ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১৭.৪ কোটি। এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের জন্য ২৫ লক্ষ কর্মী মোতায়েনের অর্থ হলো, প্রতি ৭০ জন ভোটারের জন্য গড়ে ১ জন করে নির্বাচন আধিকারিক বা কর্মী উপস্থিত থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নিঃসন্দেহে একটি বিশাল মাপের ব্যবস্থাপনা যা ভোট পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি অনন্য নজির।
দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner) শ্রী জ্ঞনেশ কুমার (Gyanesh Kumar) নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার সময় স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন যে, ভোট প্রক্রিয়াকে যেকোনো মূল্যে সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীন রাখতে হবে। কোনোরকম ভয়, ভীতি বা আর্থিক প্রলোভন ছাড়া প্রতিটি সাধারণ ভোটার যাতে নিজের অধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে সমস্ত স্তরের আধিকারিকদের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কর্মী মোতায়েনের বিস্তারিত পরিসংখ্যান
সম্পূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে এই ২৫ লক্ষ কর্মীকে সুনির্দিষ্টভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন প্রায় ১৫ লক্ষ পোলিং পার্সোনেল বা ভোটকর্মী। এলাকার সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি সুনিশ্চিত করতে মোতায়েন করা হচ্ছে ৮.৫ লক্ষ নিরাপত্তা রক্ষী। এছাড়াও, ভোট গণনার জন্য ৪০ হাজার কাউন্টিং পার্সোনেল, ৪৯ হাজার মাইক্রো-অবজারভার, ২১ হাজার সেক্টর অফিসার এবং ভোট গণনার সময় বিশেষ নজরদারির জন্য অতিরিক্ত ১৫ হাজার মাইক্রো-অবজারভার নিয়োগ করা হয়েছে।
ga


ভোটারদের সুবিধার্থে বিশেষ হেল্পলাইন
সাধারণ ভোটারদের সুবিধা এবং যেকোনো জরুরি অভিযোগ জানানোর জন্য মাঠ পর্যায়ে ২.১৮ লক্ষেরও বেশি বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও (BLO) সর্বদা প্রস্তুত রয়েছেন। ভোটাররা সরাসরি ফোন কলের মাধ্যমে বা ইসিআইনেট অ্যাপ (ECINet App)-এর ‘বুক-এ-কল’ সুবিধার মাধ্যমে তাদের সাথে সহজেই যোগাযোগ করতে পারবেন। এছাড়া, যেকোনো অভিযোগ বা জিজ্ঞাস্যের জন্য জেলা নির্বাচন আধিকারিক স্তরে বিশেষ টোল-ফ্রি কল সেন্টার নম্বর +৯১ (এসটিডি কোড) ১৯৫০ চালু করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের কড়া নজরদারি
নির্বাচনে শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ৮৩২টি বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য মোট ১,১১১ জন কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক মোতায়েন করা হয়েছে। এঁরা মূলত নির্বাচন কমিশনের ‘চোখ ও কান’ হিসেবে সরাসরি কাজ করবেন। এই পর্যবেক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন ৫৫৭ জন সাধারণ পর্যবেক্ষক, ১৮৮ জন পুলিশ পর্যবেক্ষক এবং ৩৬৬ জন ব্যয় পর্যবেক্ষক। এঁরা প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং প্রার্থীদের সাথে দেখা করবেন এবং নির্বাচন সংক্রান্ত যেকোনো অভাব-অভিযোগ মনোযোগ সহকারে শুনবেন।
জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১-এর ২৮এ ধারা অনুযায়ী, মোতায়েন করা সমস্ত কর্মী এই সময়কালে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের অধীনে প্রেষণে বা ডেপুটেশনে আছেন বলে আইনত গণ্য করা হবে। নয়াদিল্লি (New Delhi) থেকে আসা এই কড়া নির্দেশিকা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, এবারের মেগা নির্বাচনে কোনো স্তরেই সামান্যতম গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রাজ্যে, এই বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা রক্ষী এবং কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মনে বাড়তি ভরসা জোগাবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

Recent Comments