নেপালের (Nepal) রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক এবং অভাবনীয় মোড়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে গত সেপ্টেম্বরে রাজপথে নেমে গর্জে উঠেছিল সে দেশের তরুণ প্রজন্ম। সেই জেন-জি বা জেনারেশন জেড-এর তীব্র বিক্ষোভের সময় ৭৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় এবার চরম পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে বর্ষীয়ান রাজনীতিক তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে (K.P. Sharma Oli)। শনিবার সকালে তাঁকে এবং তাঁর সরকারের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককে (Ramesh Lekhak) পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের মুখপাত্র ওম অধিকারী (Om Adhikari) এই হাই-প্রোফাইল গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। শনিবার সকালের দিকে ওলির বাসভবন থেকে তাঁকে তুলে নিয়ে যায় বিশাল পুলিশ বাহিনী। ওলির রাজনৈতিক দল, কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল – ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট লেনিনিস্ট (Communist Party of Nepal – Unified Marxist Leninist) বা সিপিএন-ইউএমএল-এর শীর্ষ নেতা মিন বাহাদুর শাহী (Min Bahadur Shahi) সংবাদমাধ্যমের কাছে এই গ্রেপ্তারের খবরটি স্বীকার করে নিয়ে জানিয়েছেন, “আজ সকালে ওনার বাসভবন থেকেই ওঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”
একটু পিছনের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু (Kathmandu) সহ বিভিন্ন শহরের রাজপথে নেমে আসে হাজার হাজার ক্ষুব্ধ তরুণ-তরুণী। দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন দ্রুত এক বিশাল আকার ধারণ করে, যা বিশ্বজুড়ে ‘জেন-জি বিক্ষোভ’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎকালীন প্রশাসন যে অত্যন্ত কঠোর দমনপীড়নের পথ বেছে নিয়েছিল, তার জেরেই মাত্র দু’দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৭৬ জন তরতাজা ও নিরপরাধ মানুষ। এই মর্মান্তিক এবং ন্যক্কারজনক ঘটনার পরেই দেশের ভেতর ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রবল চাপের মুখে পড়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি।
পদত্যাগের পর, ওই বিক্ষোভের সময় হওয়া নজিরবিহীন সহিংসতার তদন্তের জন্য একটি বিশেষ প্যানেল বা স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। চলতি সপ্তাহে সেই প্যানেল তাদের বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিয়েছে। ওই রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ৭৪ বছর বয়সী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ওলি তাঁর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি এবং তাঁর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক চাইলেই এই নিষ্ঠুর পুলিশি ক্র্যাকডাউন এবং এতগুলো মানুষের মৃত্যু এড়াতে পারতেন। কিন্তু তাঁদের চরম গাফিলতি এবং উদাসীনতার কারণেই পরিস্থিতি একেবারে হাতের বাইরে চলে যায়। তদন্ত প্যানেলের এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্টের এবং তাদের কড়া সুপারিশের ভিত্তিতেই শনিবার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি পদক্ষেপ নিল পুলিশ প্রশাসন।
একদিকে যখন প্রবল ক্ষমতাশালী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জেলের পথে, অন্যদিকে নেপালের মসনদে বসেছেন সম্পূর্ণ এক নতুন মুখ, যা রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। যিনি পেশায় ছিলেন একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় র্যাপার, সেই র্যাপার থেকে সোজা দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অবিশ্বাস্য উত্থান ঘটেছে বালেন্দ্র শাহের (Balendra Shah)। গত ৫ মার্চ নেপালে সাধারণ সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে দেশের আপামর তরুণ সমাজের বিপুল জনসমর্থন নিয়ে অভাবনীয় জয়লাভ করেন বালেন্দ্র শাহ। শুক্রবার, অর্থাৎ ওলির গ্রেপ্তারের ঠিক একদিন আগেই, তিনি দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেছেন।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরাট ও যুগান্তকারী পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা এবং তরুণদের যৌক্তিক প্রতিবাদের কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হওয়া পুরনো দিনের ডাকসাইটে রাজনীতিবিদদের চূড়ান্ত পতন, এবং অন্যদিকে একদম নতুন প্রজন্মের এক সাধারণ নেতার দেশের সর্বোচ্চ শাসনক্ষমতায় আরোহণ— এই দুইয়ে মিলে নেপালে যে এক সম্পূর্ণ নতুন যুগ শুরু হতে চলেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।


Recent Comments