ভারতের (India) অন্যতম সেরা ম্যানেজমেন্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আইআইএম কলকাতার শীর্ষ পদে আসতে চলেছেন এক পরিচিত ও বহুচর্চিত নাম। বোর্ড অফ গভর্নর্সের নতুন চেয়ারপার্সন হিসেবে নিযুক্ত হলেন জেএনইউ-এর প্রাক্তন উপাচার্য এবং ইউজিসি-র প্রাক্তন চেয়ারম্যান এম. জগদেশ কুমার। দেশের উচ্চশিক্ষা মহলে তাঁর এই নতুন দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের তরফ থেকে গত বৃহস্পতিবার এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়েছে। দেশের মাননীয়া রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, যিনি পদাধিকারবলে উক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ‘ভিজিটর’, তাঁর সুস্পষ্ট সুপারিশ এবং অনুমোদনের ভিত্তিতেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে সরকারি নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। নিউজস্কোপ বাংলার (Newscope Bangla) বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, এই নিয়োগ দেশের ম্যানেজমেন্ট শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হতে চলেছে।
নিয়োগের মেয়াদ ও শূন্যপদের ইতিহাস
শিক্ষা মন্ত্রকের জারি করা নির্দেশিকায় বলা হয়েছে যে, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট আইন, ২০১৭-এর ১০(২)(এ) এবং ১০এ(১) ধারায় প্রদত্ত বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে।
- কার্যকালের মেয়াদ: এম. জগদেশ কুমারের এই পদে কার্যকালের মেয়াদ হবে চার বছর অথবা তাঁর ৭৪ বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত। এই দুটির মধ্যে যেটি আগে ঘটবে, সেই সময়সীমা পর্যন্ত তিনি চেয়ারপার্সন পদে বহাল থাকবেন।
- শূন্যপদের নেপথ্যে: গত বছরের ৮ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন চেয়ারপার্সন শ্রীকৃষ্ণ জি. কুলকার্নি (Shrikrishna G. Kulkarni) তাঁর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। তারপর থেকেই এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদটি শূন্য পড়ে ছিল। প্রায় তিন মাস ধরে চলা জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সেই শূন্যস্থান পূরণ করা হলো।
বিতর্কে মোড়া অতীত এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা
এম. জগদেশ কুমার দেশের শিক্ষা জগতে অত্যন্ত সুপরিচিত হলেও তাঁর কার্যকাল বরাবরই নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি যখন জেএনইউ-এর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন থেকেই তাঁর একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ছাত্র ও শিক্ষক মহলে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
জেএনইউ-তে তাঁর আমলের কিছু উল্লেখযোগ্য বিতর্ক:
- বঞ্চিতদের জন্য বিশেষ নীতি বাতিল: দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমফিল এবং পিএইচডি কোর্সের ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা ‘ডেপ্রিভেশন পলিসি’ বা বঞ্চনা নীতি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেন। জেএনইউ ছিল দেশের একমাত্র কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে এই বিশেষ নীতি চালু ছিল। এর মাধ্যমে দেশের পিছিয়ে পড়া ও আর্থসামাজিকভাবে অনগ্রসর অঞ্চল থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের ভর্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ওয়েটেজ পয়েন্ট দেওয়া হতো। এই নীতি বাতিলের ফলে প্রবল ছাত্রবিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় প্রশাসনকে।
- প্রবেশিকা পরীক্ষা আউটসোর্স করা: ২০১৮ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (National Testing Agency) বা এনটিএ (NTA)-র হাতে তুলে দেন। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে খরচ করতে হয়েছিল প্রায় ৯ কোটি টাকা। অভিযোগ ওঠে, বিশ্ববিদ্যালয় নিজে পরীক্ষা পরিচালনা করলে যে পরিমাণ খরচ হতো, এই আউটসোর্সিংয়ের ফলে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ অকারণে ব্যয় হয়েছে।
- নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ: উপাচার্য থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম এবং স্বজনপোষণের গুরুতর অভিযোগও একাধিকবার সামনে এসেছিল।
ইউজিসি চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর ভূমিকা: জেএনইউ-এর উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি ইউজিসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সেখানেও তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের অন্ত ছিল না।
- ২০২২ সালে তাঁর নেতৃত্বেই স্নাতক স্তরে ভর্তির জন্য দেশজুড়ে প্রথমবারের মতো চালু হয় ‘কমন ইউনিভার্সিটি এন্ট্রান্স টেস্ট’ (Common University Entrance Test) বা সিইউইটি (CUET)।
- এই একক প্রবেশিকা পরীক্ষাকে ঘিরে প্রথম দিকে চরম পরিকাঠামোগত বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। পরীক্ষা আয়োজনে ব্যাপক বিলম্ব এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রভর্তি প্রক্রিয়া মাসের পর মাস পিছিয়ে যায়। ফলস্বরূপ, প্রথম দিকে বহু আসন শূন্য পড়ে থাকার মতো অনভিপ্রেত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যা নিয়ে পড়ুয়াদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দেয়।
আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ
বিতর্কিত অতীত থাকা সত্ত্বেও, দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের নিরিখেই তাঁকে এই গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট হিসেবে পরিচিত কলকাতার এই প্রতিষ্ঠানে তিনি তাঁর অতীত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কীভাবে প্রশাসনিক দক্ষতা প্রমাণ করেন, এবং পূর্বের বিতর্কগুলিকে পিছনে ফেলে কীভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
