হিমালয়ের কোলে অবস্থিত প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপালে কি এবার এক নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা হতে চলেছে? সদ্য অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের (General Election) প্রাথমিক ভোট গণনার যে পরিসংখ্যান সামনে আসছে, তাতে কিন্তু ঠিক সেরকমই জোরালো ইঙ্গিত মিলছে। গত বছরের রক্তাক্ত ছাত্র-যুব আন্দোলনের পর হওয়া এই প্রথম নির্বাচনে দেশের প্রবীণ ও হেভিওয়েট রাজনৈতিক নেতাদের জোর ধাক্কা দিয়ে মসনদের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে নবীন প্রজন্মের প্রতিনিধিরা। প্রাথমিক গণনায় দেখা যাচ্ছে, দেশের পুরনো এবং শক্তিশালী দলগুলিকে কয়েক যোজন পিছনে ফেলে বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন কাঠমান্ডুর (Kathmandu) প্রাক্তন মেয়র এবং জনপ্রিয় র্যাপার বলেন্দ্র শাহের দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি বা আরএসপি (RSP)।
জেন-জ়ি বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তন
নেপালের এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। সেই সময় দুর্নীতির প্রতিবাদ এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের দাবিতে দেশের রাজপথে নেমে এসেছিল হাজার হাজার তরুণ-তরুণী। যাকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘জেন-জ়ি প্রোটেস্ট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। সেই প্রবল জনরোষ এবং পুলিশের গুলিতে একাধিক আন্দোলনকারীর মৃত্যুর পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে. পি. শর্মা ওলি (K.P. Sharma Oli) পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি (Sushila Karki)-র নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই নির্বাচনের আয়োজন করেছে।
প্রাথমিক গণনায় আরএসপি-র ঝড়
ভোটের বাক্স খুলতেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নেপালের তরুণ প্রজন্ম এবার পরিবর্তনের পক্ষেই নিজেদের রায় দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নেপালে যে ১৬৫টি আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচন হচ্ছে, তার মধ্যে ৫০টিরও বেশি আসনে প্রবল আধিপত্য বিস্তার করে এগিয়ে রয়েছে বলেন্দ্র শাহের দল।
অন্যদিকে, দেশের তিনবারের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কে. পি. শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল বা সিপিএন-ইউএমএল (CPN-UML) মাত্র ৫টি আসনে লিড ধরে রাখতে পেরেছে। একই করুণ দশা দেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল নেপালী কংগ্রেস (Nepali Congress)-এরও। গগন থাপার (Gagan Thapa) নেতৃত্বাধীন এই দলটি মাত্র ৫টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকে এটা পরিষ্কার যে, দেশের মানুষ এবার পুরনো নেতাদের ওপর আর ভরসা রাখতে চাইছেন না।
ঝাপা-৫ আসনের হাই-ভোল্টেজ লড়াই
এই নির্বাচনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে ঝাপা-৫ (Jhapa-5) আসনটি। এটি মূলত ওলির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক গড় হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এবার তাঁকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে এই কেন্দ্র থেকেই প্রার্থী হয়েছেন খোদ ৩৫ বছর বয়সী বলেন্দ্র শাহ, যিনি তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘বালেন’ (Balen) নামেই বেশি পরিচিত।
প্রাথমিক ভোট গণনায় এই কেন্দ্রেও রীতিমতো চমক দেখা গিয়েছে। নিজের খাসতালুকে বালেনের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছেন ৭৪ বছরের প্রবীণ নেতা ওলি। কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র বালেন ইতিমধ্যেই এখানে হাজারেরও বেশি ভোটের আরামদায়ক ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছেন। এই জয় যদি নিশ্চিত হয়, তবে তা নেপালের রাজনীতিতে এক আক্ষরিক অর্থেই ‘ভূমিকম্প’ ডেকে আনবে।
তরুণ প্রজন্মের নতুন আইকন ‘বালেন’
পেশায় একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং জনপ্রিয় র্যাপার থেকে রাজনীতিতে আসা বালেন গত কয়েক বছরে নেপালের তরুণদের কাছে এক অন্যতম আইকনে পরিণত হয়েছেন। ২০২২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনি কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তি, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সরাসরি মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং স্পষ্টবাদী মানসিকতা তাঁকে এই বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। আরএসপি-র নির্বাচনী ইস্তেহারেও বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি, সার্বিক স্বাস্থ্যবিমা এবং অর্থনীতির উন্নতির মতো বিষয়গুলিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মন জয় করেছে।
এখন চূড়ান্ত ফলাফলের দিকেই তাকিয়ে গোটা দেশ। যদি বর্তমান ট্রেন্ড বজায় থাকে, তবে নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের জন্য কোনও প্রতিষ্ঠিত এবং দীর্ঘদিনের প্রাচীন দলের বাইরে গিয়ে একটি নতুন প্রজন্মের দল সরকার গঠন করতে পারে। এই ঐতিহাসিক পালাবদলের দিকে শুধু নেপাল নয়, ভূ-রাজনৈতিক কারণে তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে প্রতিবেশী ভারতেরও (India)।
