সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনগুলিতে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রেরণাদায়ক চিত্র উঠে এসেছে। দেখা যাচ্ছে, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে মহিলারা এখন আর পিছিয়ে নেই, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তারা পুরুষদের ছাপিয়ে গেছেন। বিশেষ করে আসাম (Assam), কেরালা (Kerala) এবং পুদুচেরি (Puducherry)-তে মহিলাদের ভোটদানের হার সর্বকালের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে, যা গোটা দেশের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়।
পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, এই তিনটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে মহিলারা বিপুল উৎসাহের সঙ্গে ভোটকেন্দ্রগুলিতে উপস্থিত হয়েছেন এবং নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। পুদুচেরিতে মহিলা ভোটারদের ভোটদানের হার ছিল চমকে দেওয়ার মতো ৯১.৪ শতাংশ। অন্যদিকে সেখানে পুরুষদের ভোটদানের হার ছিল ৮৮.১ শতাংশ। অর্থাৎ, এখানে মহিলারা ৩.২ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে পুরুষদের পিছনে ফেলে দিয়েছেন।
একইভাবে উত্তর-পূর্ব ভারত (India)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য আসামেও মহিলাদের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ চোখে পড়েছে। আসামে মহিলা ভোটারদের উপস্থিতির হার ছিল ৮৬.৫ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের উপস্থিতির হার ছিল ৮৫.৩ শতাংশ। এখানে ব্যবধান ১.১ শতাংশ পয়েন্ট হলেও, সামগ্রিকভাবে মহিলাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে তারা রাজনৈতিকভাবে কতটা সচেতন হয়ে উঠছেন এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
তবে সবচেয়ে বড় চমক দেখা গেছে দক্ষিণ ভারতের রাজ্য কেরালাতে। সেখানে লিঙ্গভিত্তিক ভোটদানের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি। কেরালায় ৮১.২ শতাংশ মহিলা ভোটার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। এর বিপরীতে পুরুষ ভোটারদের হার ছিল ৭৫.১ শতাংশ। অর্থাৎ কেরালায় মহিলারা প্রায় ৬ শতাংশ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে পুরুষদের পিছনে ফেলে দিয়েছেন। মহিলাদের এই বিপুল অংশগ্রহণ এই তিনটি অঞ্চলের সামগ্রিক ভোটদানের হারকেও একধাক্কায় অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে, যা একটি সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কেন হঠাৎ করে মহিলাদের মধ্যে এই রাজনৈতিক সচেতনতা বা ভোটদানের এমন প্রবল উৎসাহ দেখা যাচ্ছে? এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতি। বর্তমান সময়ে প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলই বুঝতে পেরেছে যে, নির্বাচনে জয়লাভ করতে হলে মহিলা ভোটারদের সমর্থন অত্যন্ত জরুরি। তাই তারা নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারে মহিলাদের জন্য বিশেষ প্রতিশ্রুতি রাখছেন।
উদাহরণস্বরূপ, কেরালায় রাজনৈতিক দল এলডিএফ (LDF) তাদের ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ ৫০ শতাংশে উন্নীত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। অন্যদিকে বিরোধী দল ইউডিএফ (UDF) প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা ক্ষমতায় এলে রাজ্যের সরকারি বাসগুলিতে মহিলাদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে যাতায়াতের ব্যবস্থা করবে। এই ধরনের প্রতিশ্রুতিগুলো সরাসরি মহিলাদের দৈনন্দিন জীবন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত, যা তাদের ভোটদানে উৎসাহিত করছে।
একজন প্রতিবেদক হিসেবে এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আগামী দিনে ভারতের রাজনীতিতে মহিলা ভোটাররাই হতে চলেছেন সবচেয়ে বড় নির্ণায়ক শক্তি বা ‘কিংমেকার’। যে দল মহিলাদের নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়নের সঠিক রূপরেখা তুলে ধরতে পারবে, মহিলারা তাদের পক্ষেই নিজেদের রায় দেবেন। এই প্রতিবেদনটি থেকে এটা অন্তত পরিষ্কার যে, দেশের নারীশক্তি এখন আর কেবল ঘরের চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ নেই; তারা রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণেও সমানভাবে অংশগ্রহণ করছেন।


Recent Comments