বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ বা নামিদামি বহুজাতিক সংস্থায় ইন্টার্নশিপ করার স্বপ্ন অনেক মেধাবী পড়ুয়ারই থাকে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই স্বপ্নের পথে মূল বাধা হয়ে দাঁড়ায় বিশাল অঙ্কের খরচ। এই সমস্যার পাকাপাকি সমাধানে এবার এগিয়ে এল দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আইআইটি খড়গপুর (IIT Kharagpur)। বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পড়ুয়াদের আরও বেশি করে তুলে ধরতে এবং আন্তর্জাতিক ইন্টার্নশিপের সুযোগ কয়েকগুণ বাড়াতে এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জানা গিয়েছে, বিটেক, পাঁচ বছরের ডুয়েল ডিগ্রি এবং এমটেক পড়ুয়াদের জন্য এই প্রথমবার বড়সড় আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদান করতে চলেছে এই স্বনামধন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি। প্রাথমিকভাবে অন্তত ১০০ জন পড়ুয়াকে এই সাহায্য দেওয়া হবে। এর ফলে তারা বিদেশে গিয়ে ‘সেমিস্টার অ্যাওয়ে’ (Semester Away) প্রোগ্রামের অধীনে পড়াশোনা করার সুযোগ পাবেন। এই গ্রীষ্মকাল থেকেই এই নয়া উদ্যোগ শুরু হতে চলেছে, যা মূলত প্রতিষ্ঠানটির প্ল্যাটিনাম জুবিলি বা ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপনেরই একটি অংশ।
শুধুমাত্র স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরের পড়ুয়ারাই নন, পিএইচডি এবং পোস্টডক্টরাল স্কলারদের জন্যও থাকছে বড় সুখবর। তাঁরা যাতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গবেষণাগারগুলোতে স্বল্প সময়ের বদলে দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার কাজে যুক্ত থাকতে পারেন, তার জন্য বিশেষ বর্ধিত আর্থিক সহায়তার প্রকল্পও চালু করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর সুমন চক্রবর্তী (Suman Chakraborty) সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জটিল এবং বড় সমস্যাগুলোর সমাধান কোনো ছোট গণ্ডির মধ্যে বা নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে আটকে থেকে করা সম্ভব নয়। এই প্ল্যাটিনাম জুবিলির বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা নিজেদের এমন এক আন্তর্জাতিক মিলনক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছি, যেখানে বিশ্বের সেরা প্রতিভারা একত্রিত হয়ে মানবতার কল্যাণে কাজ করবে।” তিনি আরও জানান যে, ভারতের প্রথম আইআইটি হিসেবে এটি তাদের বৃহত্তর লক্ষ্য এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই প্রতিফলিত করে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক ডিন আনন্দরূপ ভট্টাচার্য (Anandaroop Bhattacharya) পড়ুয়াদের বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পাঠ্যক্রম অনুযায়ী ছাত্রছাত্রীদের জন্য ইন্টার্নশিপ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক সময় বিদেশের নামিদামি প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেলেও শুধুমাত্র টাকার অভাবে অনেক পড়ুয়াই তা গ্রহণ করতে পারেন না। ইউরোপ (Europe), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA), অস্ট্রেলিয়া (Australia) বা সিঙ্গাপুরের (Singapore) মতো উন্নত দেশগুলোতে কোনো আর্থিক সাহায্য ছাড়া একটি সেমিস্টার কাটানো বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীর পক্ষেই প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। তাই এই নতুন আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করা মাত্রই পড়ুয়াদের তরফ থেকে অভূতপূর্ব এবং ব্যাপক সাড়া মিলেছে বলে তিনি জানিয়েছেন। সম্পূর্ণ কঠোর স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য পড়ুয়াদের এই স্কলারশিপের জন্য বেছে নেওয়া হবে।
বিদেশি পড়ুয়াদের জন্যও থাকছে বিশেষ ফেলোশিপ
শুধু নিজেদের পড়ুয়াদের বিদেশে পাঠানোই নয়, বিদেশি পড়ুয়া এবং গবেষকদের নিজেদের ক্যাম্পাসে আকৃষ্ট করতেও একাধিক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে ৬০ জনের বেশি বিদেশি পড়ুয়া পড়াশোনা করছেন। আগামী দুই বছরের মধ্যে এই সংখ্যা অন্তত দুই থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ডিরেক্টর আরও জানান যে, আন্তর্জাতিক স্কলারদের জন্য মেধা-ভিত্তিক ফেলোশিপ চালু করা হচ্ছে। ‘গ্লোবাল চ্যালেঞ্জ স্কিম’ এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল সামার রিসার্চ প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে বিদেশি পড়ুয়া ও গবেষকরা সম্পূর্ণ খরচে এখানে এসে স্থানীয় ভারতীয় দলগুলোর সাথে কাজ করতে পারবেন।
এছাড়া, গবেষণার মান আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যেতে ‘প্ল্যাটিনাম জুবিলি বাইল্যাটারাল রিসার্চ ইনিশিয়েশন স্কিম’ চালু করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের অধীনে আন্তর্জাতিক পার্টনারদের সাথে যৌথ গবেষণার জন্য প্রতিটি প্রোজেক্টে ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত প্রাথমিক তহবিল বা ‘সিড ফান্ডিং’ প্রদান করা হবে। পাশাপাশি, বিদেশি অধ্যাপকরাও এখানে এসে পড়ানোর সুযোগ পাবেন, যাকে ‘কো-টিচিং’ বলা হচ্ছে। এর ফলে যারা বিদেশে যেতে পারছেন না, তারাও ক্যাম্পাসে বসেই বিশ্বমানের শিক্ষা লাভ করবেন।

