পশ্চিম এশিয়ায় (West Asia) চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গোটা বিশ্বেই এক গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে নানা মহলে তীব্র জল্পনা চলছে। তবে ভারত (India) এই কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। সোমবার লোকসভায় (Lok Sabha) দেওয়া এক বিশেষ ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন যে, সরকার আগে থেকেই প্রয়োজনীয় সব রকম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে, যার ফলে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর এর কোনো বড় প্রভাব পড়বে না।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেন, দেশ তার জ্বালানি আমদানির উৎসগুলি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। তিনি বলেন, “আগে আমরা মাত্র ২৭টি দেশ থেকে অশোধিত তেল এবং গ্যাস আমদানি করতাম। কিন্তু বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে ৪১-এ দাঁড়িয়েছে।” এই বৈচিত্র্যকরণের ফলেই আজ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) দিয়ে পণ্য পরিবহনে বাধা সৃষ্টি হলেও, দেশে পেট্রোল, ডিজেল, এলপিজি (LPG) এবং পিএনজি (PNG)-এর সরবরাহে কোনো ঘাটতি দেখা দেয়নি।
সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তা সত্ত্বেও, বর্তমান সঙ্কটের সময়ে গৃহস্থালির দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর বিষয়টিকেই প্রশাসন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। যাতে সাধারণ পরিবারগুলিকে কোনোভাবেই সমস্যায় পড়তে না হয়, তার জন্য দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও বাড়ানো হচ্ছে।
যুদ্ধের কারণে কৃষিক্ষেত্র বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে বিষয়েও প্রশাসন সজাগ রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “সামনেই গ্রীষ্মকাল আসছে, যখন বিদ্যুতের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। আমি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমাদের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমাণ কয়লা মজুত রয়েছে। ফলে কোনোভাবেই বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা পাওয়ার কাট হবে না।” এছাড়া কৃষকদের যাতে সারের কোনো অভাব না হয়, তার জন্যও বিকল্প দেশ থেকে প্রয়োজনীয় সার আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বিগত কয়েক বছরে ইথানল ব্লেন্ডিং (Ethanol Blending) বা পেট্রোলের সাথে ইথানল মেশানোর প্রক্রিয়ায় অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। এক দশক আগে যেখানে মাত্র ১ থেকে ১.৫ শতাংশ ইথানল মেশানো হতো, আজ তা প্রায় ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে চার কোটি ব্যারেল অশোধিত তেল আমদানি কমানো সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ এবং রেলের বৈদ্যুতিকীকরণের মতো পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপগুলিও শক্তির স্বয়ংসম্পূর্ণতা বাড়াতে সাহায্য করেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে হঠাৎ কোনো বড় উত্থান-পতন ঘটলে বা সরবরাহে আকস্মিক ব্যাঘাত ঘটলে তা সামাল দেওয়ার জন্য বিগত এক দশকে কৌশলগত তেলের মজুত ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে ৫৩ লক্ষ মেট্রিক টনেরও বেশি জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং এই বিশেষ আপৎকালীন মজুত ক্ষমতাকে ৬৫ লক্ষ মেট্রিক টনে উন্নীত করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। সঙ্কট মোকাবিলার জন্য কেন্দ্র একটি বিশেষ আন্তঃমন্ত্রণালয় গোষ্ঠী গঠন করেছে, যারা প্রতিদিন বৈঠক করে পরিস্থিতির বিস্তারিত পর্যালোচনা করছে। সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখতে এবং কালোবাজারি সম্পূর্ণভাবে রুখতে রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে সমন্বয় রেখে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। পরিশেষে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ওই সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে প্রায় এক কোটি ভারতীয় বসবাস করেন। তাঁদের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ভারতীয় দূতাবাসগুলি দিনরাত এক করে কাজ করছে এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকদের সাহায্য করতে সর্বদা প্রস্তুত।


Recent Comments