সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার উপকূলে একটি অভাবনীয় ও ভয়াবহ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে চরম উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ভারতের বিশাখাপত্তনমে একটি আন্তর্জাতিক নৌসেনা মহড়ায় যোগ দিতে এসেছিল ইরানের রণতরী ‘ডেনা’। মহড়া শেষে দেশের উদ্দেশ্যে ফেরার পথে শ্রীলঙ্কার জলসীমার কাছে আমেরিকার নৌবাহিনী ওই ইরানি জাহাজের ওপর অতর্কিত টর্পেডো হামলা চালায়। এই ভয়াবহ হামলায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় জাহাজটি। ঘটনার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর এবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি জারি করে নিজেদের অবস্থান এবং উদ্ধারকাজে তাদের ভূমিকার কথা জানাল ভারতীয় নৌবাহিনী।
বিপদবার্তা ও ভারতের উদ্ধারকাজ
ভারতীয় নৌসেনার তরফ থেকে বৃহস্পতিবার একটি বিস্তারিত বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে, গত বুধবার, ৪ মার্চ সকালে শ্রীলঙ্কার কলম্বো (Colombo) নৌ সহায়তা কেন্দ্রে ইরানের রণতরী ‘ডেনা’ থেকে একটি জরুরি বিপদবার্তা (Distress Call) এসে পৌঁছায়। সেই সময় জাহাজটি শ্রীলঙ্কার জলসীমার মধ্যেই অবস্থান করছিল।
শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর কাছ থেকে এই খবর পাওয়া মাত্রই দ্রুত পদক্ষেপ নেয় ভারত। সকাল ১০টা নাগাদ ভারতীয় নৌবাহিনী উদ্ধারকাজে সরাসরি যুক্ত হয়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “উদ্ধার অভিযানের জন্য ভারতীয় নৌসেনার দূরপাল্লার সামুদ্রিক টহলদারি বিমান মোতায়েন করা হয়েছিল। পাশাপাশি, জরুরি প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে দ্বিতীয় আরও একটি বিমানকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। তবে গোটা উদ্ধারকাজটি পরিচালিত হয়েছে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর নেতৃত্বেই।”
ভারতীয় রণতরীর মানবিক পদক্ষেপ
ঘটনার সময় শ্রীলঙ্কার জলসীমার কাছাকাছিই টহল দিচ্ছিল ভারতের রণতরী ‘আইএনএস তরঙ্গিনী’ (INS Tarangini)। বিপদবার্তা পেয়ে বিকেল ৪টে নাগাদ সেটিও উদ্ধারকাজে যোগ দেয়। এছাড়া, উদ্ধারকাজে আরও গতি আনতে কেরলের (Kerala) কোচি (Kochi) নৌঘাঁটি থেকে পাঠানো হয় আরও একটি অত্যাধুনিক রণতরী ‘আইএনএস ইক্ষক’ (INS Ikshak)। ভারতীয় নৌসেনা স্পষ্ট জানিয়েছে, মানবিকতার খাতিরে এই রণতরীটি এখনও দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি মোতায়েন রয়েছে এবং শ্রীলঙ্কার প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নিখোঁজদের সন্ধানে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই বিবৃতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়ে ভারতীয় বাহিনীর তরফে কোনও সরাসরি মন্তব্য করা হয়নি।
ব্যাপক প্রাণহানি এবং নিখোঁজদের সন্ধান
ইরানের প্রশাসন সূত্রে খবর, রণতরী ‘ডেনা’-তে মোট ১৩০ জন নাবিক ও নৌসেনা কর্মী ছিলেন। মার্কিন ডুবোজাহাজ থেকে ছোঁড়া টর্পেডোর আঘাতে এখনও পর্যন্ত ৮৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। জীবিত অবস্থায় জল থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৩২ জনকে। বর্তমানে তাঁরা শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এখনও বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তবে ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায়, তাঁদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কূটনৈতিক স্তরে তৎপরতা
এই হামলার ঘটনার পর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও চরম পারদ চড়েছে। আমেরিকার এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা করে চরম প্রত্যাঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি (Abbas Araghchi)। অন্যদিকে, এই অস্থির পরিস্থিতির মাঝেই বৃহস্পতিবার ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (S. Jaishankar) ফোনে কথা বলেন ইরানি বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই (Ayatollah Ali Khamenei)-এর মৃত্যু নিয়ে ভারত এতদিন কূটনৈতিক নীরবতা পালন করছিল। তবে বৃহস্পতিবার ভারতের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর মৃত্যুর জন্য শোকপ্রকাশ করা হয়েছে। ভারতের বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রী (Vikram Misri) নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাসে গিয়ে শোকজ্ঞাপন করেন। এরপরই নৌবাহিনীর এই আনুষ্ঠানিক বিবৃতি, যা আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের ভারসাম্য বজায় রাখার কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
