পশ্চিম এশিয়ায় (West Asia) চলমান ইরান (Iran) এবং ইসরায়েল (Israel) সংঘাত ক্রমশ এক ভয়াবহ যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে। ধ্বংসলীলা এবং উত্তেজনার পারদ এতটাই চড়েছে যে, পুরো বিশ্ব এক অজানা আতঙ্কে দিন গুনছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র (United States) তাদের একজন নিখোঁজ পাইলটকে উদ্ধার করেছে, যার এফ-১৫ (F-15) যুদ্ধবিমানটি ইরানি আকাশসীমায় ভূপাতিত হয়েছিল। এই ঘটনার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) তেহরানকে (Tehran) ৪৮ ঘণ্টার এক চরম আল্টিমেটাম দিয়েছেন।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই উদ্ধার অভিযান ছিল অনেকটা হলিউডের থ্রিলার সিনেমার মতো। ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন যে, তাদের সাহসী যোদ্ধা শত্রু সীমানার ভেতর, ইরানের দুর্গম পাহাড়ে আটকা পড়েছিলেন। কয়েক ডজন বিমানের সাহায্যে এবং ২৪ ঘণ্টা নজরদারির মাধ্যমে তাকে উদ্ধার করা হয়। তবে ইরানের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি (Ebrahim Zolfaghari) জানিয়েছেন যে, দক্ষিণ ইস্পাহান (Isfahan) প্রদেশের একটি পরিত্যক্ত বিমানবন্দরে মার্কিন বাহিনীর এই উদ্ধার অভিযান তারা সফলভাবে বানচাল করে দিয়েছেন। ইরানি সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানে অংশ নেওয়া দুটি সি-১৩০ সামরিক পরিবহন বিমান এবং দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ধ্বংস করা হয়েছে।
পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয় যখন ট্রাম্প ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একটি চুক্তিতে আসার আল্টিমেটাম দেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই সময়ের মধ্যে চুক্তি না হলে ইরানকে “নরকযন্ত্রণা” ভোগ করতে হবে। তবে ইরানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা জেনারেল আলী আব্দুল্লাহি আলীআবাদি (Ali Abdollahi Aliabadi) এই হুমকিকে “অসহায়, স্নায়বিক ও বোকামি” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আক্রমণ বাড়লে পুরো অঞ্চল মার্কিন এবং ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য আক্ষরিক অর্থেই নরকে পরিণত হবে।সংঘাত এখন শুধু সামরিক ঘাঁটিতেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি ছড়িয়ে পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতেও।
শনিবার বুশেহর (Bushehr) পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি (Abbas Araghchi) জাতিসংঘের কাছে একটি জরুরি চিঠি পাঠিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, এই ধরনের হামলায় তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে, যা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। একই সময়ে, ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটি পেট্রোকেমিক্যাল হাবে হামলায় অন্তত পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।যুদ্ধের আঁচ প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। কুয়েত (Kuwait) জানিয়েছে যে, ইরানি ড্রোনের হামলায় তাদের তেল খাতের কমপ্লেক্স এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
অন্যদিকে, বাহরাইন (Bahrain) -এর রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি বাপকো এনার্জিস (Bapco Energies) জানিয়েছে যে, ইরানি ড্রোন হামলার কারণে তাদের একটি স্টোরেজ ট্যাঙ্কে আগুন ধরে যায়। লেবানন (Lebanon) ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ (Hezbollah) দাবি করেছে যে, তারা লেবানিজ উপকূল থেকে প্রায় ৬৮ নটিক্যাল মাইল দূরে একটি ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজে ক্রুজ মিসাইল দিয়ে সফল হামলা চালিয়েছে। জবাবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বৈরুত (Beirut) শহরে হিজবুল্লাহর বিভিন্ন অবকাঠামোতে তীব্র বিমান হামলা শুরু করেছে। এছাড়া আবুধাবি (Abu Dhabi) -তেও ধ্বংসাবশেষ পড়ার কারণে বোরৌজ (Borouge) কারখানার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।এই ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। ইরানে গত ৩৭ দিন ধরে ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যা দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘতম ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে, বিশ্বজুড়ে শান্তি কামনায় ইস্টার সানডে উপলক্ষে ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স স্কোয়ার (St. Peter’s Square) থেকে পোপ লিও (Pope Leo) বিশ্বনেতাদের প্রতি যুদ্ধ বন্ধ করার আবেগঘন আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “যাদের হাতে অস্ত্র আছে, তারা তা নামিয়ে রাখুন। যারা যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতা রাখেন, তারা যেন শান্তির পথ বেছে নেন।”একই সময়ে, ওমান (Oman) হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। গাজা (Gaza) -র মতো ভয়াবহ ধ্বংসলীলা এড়াতে লেবাননের প্রেসিডেন্টও ইসরায়েলের সাথে দ্রুত আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে, এই সংঘাত শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনীতি, কূটনীতি এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


Recent Comments