মধ্যপ্রাচ্যের বাতাসে এখন কেবলই বারুদের গন্ধ, কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে বোমার কান ফাটানো শব্দ। চারদিকে বাজছে যুদ্ধের দামামা, যার জেরে থমকে গেছে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। গত কয়েকদিন ধরে ইরান (Iran) এবং যুক্তরাষ্ট্র (United States) ও ইসরায়েলের (Israel) মধ্যে যে ভয়াবহ এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছে, তা বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই যুদ্ধ হয়তো আরও বড় কোনো মানবিক বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে। তবে এই ধ্বংসলীলা ও চরম উত্তেজনার মাঝেই এবার যুদ্ধ বন্ধের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান (Masoud Pezeshkian)। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরান শান্তি চায় ঠিকই, তবে সেই শান্তি কখনোই একতরফাভাবে আসবে না। তাদের নির্দিষ্ট তিনটি শর্ত মেনে নিলেই কেবল যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটবে তারা।
সম্প্রতি জনপ্রিয় মাইক্রো-ব্লগিং প্ল্যাটফর্ম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট এই শর্তগুলোর কথা প্রকাশ্যে আনেন। একই সঙ্গে তিনি রাশিয়া (Russia) এবং পাকিস্তানের (Pakistan) শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও টেলিফোনে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছেন। ফোনালাপে তিনি ওই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে তেহরানের প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে যে মূল বাধাগুলো রয়ে গেছে, সেটিও বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেননি তিনি। তার দাবি, এই অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধ মূলত বিরোধী পক্ষের চাপিয়ে দেওয়া এবং এর দায়ভার সম্পূর্ণ তাদেরই নিতে হবে।
প্রেসিডেন্টের দেওয়া শর্ত তিনটি অত্যন্ত স্পষ্ট। চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক, যুদ্ধবিরতির জন্য তেহরান ঠিক কী কী চাইছে:
১. ন্যায্য অধিকারের স্বীকৃতি: প্রথম শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, তেহরানের সার্বভৌমিকতা এবং তাদের সব ধরনের আইনি ও ন্যায্য অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে বিনা বাক্যব্যয়ে স্বীকার করে নিতে হবে। কোনোভাবেই তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্বাধীন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা চলবে না।
২. বিপুল ক্ষতিপূরণ প্রদান: গত কয়েকদিনের একনাগাড়ে চলা সংঘাতে দেশের যে বিপুল পরিমাণ অবকাঠামোগত ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য ওয়াশিংটন (Washington) এবং তেল আবিবকে (Tel Aviv) উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংসের পুরো দায়ভার তাদের নিতে হবে।
৩. ভবিষ্যতের জন্য আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি: ভবিষ্যতে যেন বিনা প্ররোচনায় তাদের ভূখণ্ডে এ ধরনের সামরিক আগ্রাসন বা বিমান হামলা চালানো না হয়, তার জন্য আন্তর্জাতিক মহল থেকে একটি দৃঢ় ও নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি দিতে হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এরই মধ্যে দ্বিতীয় সপ্তাহ পার করেছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর আকস্মিক যৌথ হামলার পর থেকেই পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। পাল্টা জবাব হিসেবে তেহরানও মুহুর্মুহু ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি হামলায় ইতোমধ্যে হাজারো সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। নারী ও শিশুদের কান্না আর আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল।
এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক খাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতেই এর এক বিশাল ধাক্কা লেগেছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ (United Nations) নিরাপত্তা পরিষদ সম্প্রতি একটি প্রস্তাব পাস করে সব পক্ষকে দ্রুত যুদ্ধ বন্ধের এবং সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) নিজেদের সাফল্য দাবি করে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অনড় অবস্থান দেখিয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।

