কমল সেনগুপ্ত, বরিশাল
ভোট নিয়ে যখন বাংলাদেশ উত্তাল, রাজনীতির আবর্ত থেকে স্বেচ্ছায় নিজেকে সরিয়ে ভাবুক কমলবাবু ডুব দিলেন আবেগের সাগরে। লিখলেন নিউজস্কোপবাংলার পাঠকদের জন্য।
‘কীর্তনখোলা নদীরে আমার।
এই নদীতে সাতার কাইটা বড় হইছি আমি
এই নদীতে আমার মায় কলসীতে নেছে পানি
আমার দিদিমা আইসা প্রতিদিন ভোরে
থাল-বাটি ধুইয়া গ্যাছে এই নদীর কিনারে।’
বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় গাওয়া সেই জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ডের গানটা যেন কীর্তনখোলারই সুর—শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নদীর বুক, নৌকার ছোটাছূটি। কীর্তনখোলা শুধু নদী নয়, বরিশালের আবেগ, বরিশালের অনুভূতি। এ নদী বরিশালের বুক চিরে বহমান, যেমন বুকের ভেতর দিয়ে বয়ে চলে মানুষের সুখ–দুঃখ, হাসি–কান্না। নদীর পশ্চিম পারে শহর—ইট, কোলাহল আর স্বপ্নের ভিড়; আর পূবে চরকাউয়া—খোলা আকাশ, সবুজ প্রকৃতি, মাটির গন্ধ। এই নদীর স্রোতে ভাসে শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপন। আড়িয়াল খাঁর শাখা হয়ে সে মেঘনায় মিশে যায়, কিন্তু বরিশালের মন থেকে কখনো আলাদা হয় না; হৃদয়ের ভেতর সে চিরকালই কীর্তন গেয়ে চলে।
স্থানীয়ভাবে নদীর নামকরণ নিয়ে নানা কথা আছে। কীর্তনখোলার পার ঘেঁষেই ছিল শহরের সবচেয়ে পুরনো হাট, প্রচলিত রয়েছে, সেই হাটখোলাতেই বসত কীর্তনের আসর—সুরে মুখরিত হত নদীর তীর। নদীর ঢেউ যেন সে সুর বহন করে নিয়ে যেত দূর-দূরান্তে। সেই থেকেই, নদীর নাম হয়ে ওঠে— কীর্তনখোলা। আবার কেউ কেউ বলেন, হাটখোলায় একসময় স্থায়ীভাবে বসবাস করত কীর্তনের দল—নদীর তীরেই ছিল তাদের ঘর, তাদের রেওয়াজ, তাদের আখড়া। কীর্তনের সুরে জেগে উঠত এ জনপদ। তাই এ নদীর নাম ‘কীর্তনখোলা’। যে ব্যাখ্যাই ধরা হোক, এ নদীর নামকরণের সাথে কীর্তনের ও কীর্তনীয়াদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
ভোরের সূর্যে রুপালি আভা ছড়িয়ে পড়ে কীর্তনখোলার বুকে। নৌকার বৈঠার ছপাৎ ছপাৎ শব্দে জেগে ওঠে ঘাটের ঘুমন্ত গল্প। তিনতলা-চারতলা লঞ্চ চলে—নদীর বুকে মানুষের স্বপ্ন বোঝাই করে। প্রতিদিন ইঞ্জিন চালিত নৌকায় এপার থেকে ওপারে ছুটে যায় মানুষ, জীবনের তাগিদে। কারও হাতে বাজারের থলে, কারও চোখে দূরের ঠিকানা। নদীর জলে ভাসে হাসি, ভাসে দীর্ঘশ্বাসও। সূর্যাস্তে কীর্তনখোলা রাঙা চাদর মেলে দেয় জলে। এই নদী শুধু জল নয়, বরিশালের মানুষের চলাচলের শিরা। কীর্তনখোলা বয়ে চলে অবিরাম। বরিশাল মহানগরীর দক্ষিণ প্রান্তে নদীর উপর আছে কীর্তনখোলা সেতু। নদীর ওপারে চরকাউয়া ও এপারে দপদপিয়া এলাকার সাথে যুক্ত করেছে। সেতুটি সড়কপথে পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ওপারে সেতুর পরেই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। ইউকিপিডিয়া সূত্রে জানা যায় কীর্তনখোলা নদীর শুরু হয়েছে বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদ থেকে। গজালিয়ার কাছে গিয়ে এটি পতিত হয়েছে গাবখান খালে। কীর্তনখোলা মূলতঃ আড়িয়াল খাঁ নদের একটি শাখা। আড়িয়াল খাঁর উৎপত্তি পদ্মা থেকে। বরিশাল শহর ঘেঁষে কীর্তনখোলা নদী পশ্চিমে এগিয়ে নলছিটি থানার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে। একটি অংশ ধানসিড়ি নাম নিয়ে কচা নদীতে গিয়ে মিশেছে। অপর অংশ মিলেছে বিষখালী নদীতে। শায়েস্তাবাদ হতে নলছিটি অবধি নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ২১ কিলোমিটার। এ জায়গায় নদীটির প্রস্থ প্রায় আধা কিলোমিটার। ব্রিটিশ আমলে এটি আরো বেশি প্রমত্তা ছিলো, সেসময়ে এর প্রস্থ ছিলো ১ কিলোমিটারের মতো। গত এক শতাব্দী ধরে চর পড়ে কীর্তনখোলার প্রস্থ কমে গেছে। কীর্তনখোলা নদীর তীরে বরিশাল নৌ বন্দর অবস্থিত, যা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী-বন্দর। বাংলা পিডিয়া সূত্রে জানা যায়, ‘অতি প্রাচীনকালে গঙ্গার তিন প্রবাহের (নলিনী, হলদিনী ও পাবনী) অন্যতম পাবনী। এটি প্রাচীন পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়ে আড়িয়াল খাঁ নামে ফরিদপুরের দক্ষিণে মাদারীপুর হয়ে কয়েকটি শাখায় বিভক্ত হয়ে বরিশালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। এক শাখা কীর্তনখোলা নামে বরিশাল শহরকে পশ্চিম তীরে রেখে দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রবাহিত হয়েছে’।
মুক্তিযুদ্ধে স্মৃতি আছে কীর্তনখোলার। নদী সংলগ্ন ত্রিশ গোডাউন এলাকায় বধ্যভূমি ছিল। পাকিস্তানী হানাদার ও দোসররা বধ্যভূমিতে শত শত মানুষকে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। মা কীর্তনখোলা সন্তানের লাশ বুকে নিয়ে বেড়িয়েছেন বহুদিন। এই নদীর জল সেদিন লাল হয়েছিল মানুষের রক্তে। দেশভাগের ক্ষত কীর্তনখোলার জলেও লুকিয়ে আছে—নীরব, অথচ গভীর। ১৯৪৭–এর দেশভাগে এই নদী ছিল এ অঞ্চলের একমাত্র বিদায়ের পথ, কান্নার সঙ্গী। প্যাডেল স্টিমারের ভেপু যেন কীর্তনখোলার বুকে ভেসে ওঠা এক দীর্ঘশ্বাস। কীর্তনখোলার ঘাটে দাঁড়িয়ে বহু মানুষ শেষবারের মতো মাটি ছুঁয়ে দেখেছিল—ফিরে আসার আশায় নয়, স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে। স্টিমারের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলেছে দেশান্তরীরা। মা কীর্তনখোলা, জন্মভূমি ত্যাগী এ সব মানুষদের বিন্দু বিন্দু চোখের জল বুকে ধারণ করেছে, নীরবে। কীর্তনখোলার আজও বহন করে চলেছে দেশ ভাগের যন্ত্রনা, দেশত্যাগের করুণ স্মৃতি।



স্টিমারের ভেপু থেমে গেছে, দেশও স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু কীর্তনখোলা বয়ে চলেছে প্রকৃতির চিরন্তন গতিতে, শোকে কষ্টে জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে। নদীর পাড়ে বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ হয়েছে। শহীদ সন্তানেরা সেখানে প্রতিদিন নীরবে দাঁড়ায়। নদীর দিকে তাকিয়ে আজও মুক্তিযুদ্ধে শহিদ মাকে খোঁজে, জোয়ার যায় ভাটা আসে, মা আর ফেরে না। অপেক্ষা শেষে নদীর জলে মাথা ভিজিয়ে প্রণতি জানায়, মাকে। ওপার বাংলার রাজারহাট থেকে বসিরহাট, ব্যারাকপুর থেকে আলিপুর প্রতিটি বাড়িতে, দেশভাগের দগদগে ক্ষত বুকে নিয়ে আসা উদ্বাস্তু মানুষগুলো, আজও মা গঙ্গাকে প্রণাম জানায়। ওদের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে কীর্তনখোলা, সেই কীর্তনখোলা, আবেগের কীর্তনখোলা। যে নদীতে সাতার কেটেছে বহুদিন, দিদিমা এসেছে রোজ সকালে। চোখ ভিজে যায় জলে। আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে হৃদয়বীণায় বেজে ওঠে আঞ্চলিক গানের সেই সুর-
‘আদম আলী হাজী মেয়ার ইটেরই খোলাতে
চড়ুই ভাতি করছি মোরা গুড়াগাড়াতে
আজ ইটের খোলা তেমন আছে
সাথীরা কোথায়?
হগলি বদলাইয়া গেছে
নদী আমার যেমন ছিলো
তেমনি আছে।
ও নদী তেমনি আছে….’

