ভারতের (India) পূর্ব প্রান্তের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) রাজনীতির ময়দানে আজ এক অন্যরকম ব্যস্ততা। রাজ্যসভা নির্বাচনের দামামা বেজে গিয়েছে বেশ কিছুদিন আগেই। সেই আবহে আজ, বৃহস্পতিবার কলকাতার (Kolkata) বিধানসভায় (Assembly) মনোনয়ন পেশ করতে হাজির হলেন তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) মনোনীত প্রার্থীরা। এদিন সকলের নজর কেড়েছেন টলিউডের (Tollywood) জনপ্রিয় অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক (Koel Mullick)। দীর্ঘদিনের সফল অভিনয় জীবন থেকে সরাসরি রাজনীতির অলিন্দে প্রবেশ করে এই প্রথমবার তিনি বিধানসভায় পা রাখলেন। অন্যদিকে, রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন ডিজি রাজীব কুমার (Rajiv Kumar) নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছুটা আগেই পৌঁছে যান মনোনয়ন জমা দিতে। এই দুই নতুন মুখের পাশাপাশি অন্যান্য হেভিওয়েট প্রার্থীদের উপস্থিতিতে আজ বিধানসভা চত্বর ছিল বেশ জমজমাট।
এদিন ঘড়ির কাঁটায় সকাল ১০টা বেজে ৪৪ মিনিট নাগাদ বিধানসভায় এসে পৌঁছান প্রাক্তন আইপিএস অফিসার রাজীব কুমার। সকলের সকাল ১১টায় আসার কথা থাকলেও তিনি অনেকটাই আগে চলে আসেন। এরপর বেশ কিছুক্ষণ একাই বসে ছিলেন পরিষদীয় দপ্তরের সচিবালয়ে। দীর্ঘ পুলিশি জীবনের পর এবার জনপ্রতিনিধি হিসেবে রাজনীতির ময়দান, নতুন এই ইনিংস প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আত্মবিশ্বাসের সুর শোনা যায় তাঁর কণ্ঠে। সমাজসেবিকা মাদার টেরিজার (Mother Teresa) একটি বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমি জানি ঈশ্বর আমাকে এমন কোনও দায়িত্ব দেবেন না যা আমি পালন করতে পারব না।” এই একটি বাক্যেই তিনি তাঁর আগামী দিনের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও দৃঢ়তার বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
অন্যদিকে, স্বামী নিসপাল সিংয়ের (Nispal Singh) হাত ধরে প্রথমবারের মতো বিধানসভায় প্রবেশ করেন টলিকুইন কোয়েল। বিনোদন জগতে তিনি যেমন সফল, রাজনৈতিক জীবনেও সাধারণ মানুষের পাশে থেকে কাজ করার প্রবল ইচ্ছে তাঁর চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল এদিন। নতুন এই অধ্যায় নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে কোয়েল বলেন, “এটি আমার জীবনের একটি সম্পূর্ণ নতুন যাত্রা। সবার ভালোবাসা ও আশীর্বাদ পেলে এই যাত্রা নিশ্চয়ই সফল হবে। আমি জানি এটা অনেক বড় একটা দায়িত্ব। তবে আমি যখন এই দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছি, তখন সফল হবই। সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করব আমি।” তৃণমূলের অপর এক প্রার্থী মেনকা গুরুস্বামী (Menaka Guruswamy) এদিন নিজের সঙ্গীকে নিয়ে বিধানসভায় এসেছিলেন। তিনি তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “আমি এই সুযোগ পেয়ে ভীষণ গর্বিত এবং সম্মানিত।” পাশাপাশি এদিন আর এক পরিচিত মুখ, প্রাক্তন মন্ত্রী ও নেতা বাবুল সুপ্রিয় (Babul Supriyo) বিধানসভায় পৌঁছান, তবে তিনি নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছুটা পরেই আসেন।
শুধুমাত্র শাসক দলই নয়, আজ মনোনয়ন জমা দিয়েছেন প্রধান বিরোধী দল বিজেপির (BJP) প্রার্থী রাহুল সিনহাও (Rahul Sinha)। আটের দশক থেকে বঙ্গ বিজেপির অন্যতম পুরনো ও পোড়খাওয়া নেতা তিনি। মাত্র ১৭ বছর বয়সে আরএসএসের (RSS) হাত ধরে গেরুয়া রাজনীতিতে পদার্পণ তাঁর। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত টানা ছয় বছর রাজ্য বিজেপির সভাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে হাবড়া থেকে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের বিরুদ্ধে প্রার্থী হলেও তিনি জয়লাভ করতে পারেননি। এরপর বেশ কিছুদিন সেভাবে দলের কোনও বড় পদে না থাকলেও, এবার তাঁকে ফের নয়াদিল্লির (New Delhi) রাজনীতিতে সামনের সারিতে এগিয়ে দিল তাঁর দল।
আগামী ১৬ মার্চ রাজ্যসভার এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, শাসক ও বিরোধী শিবিরের সমস্ত প্রার্থীই কার্যত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে রাজ্যসভায় পা রাখতে চলেছেন। সব মিলিয়ে, আজকের দিনটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এবং বিধানসভার অন্দরে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিল। রাজ্যের রাজনৈতিক মহল এখন তাকিয়ে আছে এই নতুন জনপ্রতিনিধিদের আগামী পদক্ষেপের দিকে। বিশেষত কোয়েল এবং রাজীবের মতো সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশা থেকে আসা ব্যক্তিত্বরা সংসদীয় রাজনীতিতে কতটা ইতিবাচক ছাপ ফেলতে পারেন, তা সময়ই বলবে।
