দোলের রঙে যখন গোটা শহর আবির মাখতে ব্যস্ত থাকে, তখন উত্তর কলকাতার (North Kolkata) এক কোণে নিভৃতে পালিত হয় এক অনন্য আধ্যাত্মিক দোল উৎসব। নিমতলা ঘাট (Nimtala Ghat) সংলগ্ন জরাজীর্ণ কিন্তু মহিমাময় ‘দুর্গেশ্বর শিব মন্দির’, যা স্থানীয়দের কাছে ‘মোটা মহাদেব’ (Mota Mahadev) মন্দির নামেই বেশি পরিচিত। এখানে রঙ খেলা মানে কেবল আনন্দ নয়, বরং স্বয়ং মহাদেবকে আবিরে রাঙিয়ে এক অন্যরকম আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভ করা।
৩০০ বছরের ইতিহাস ও এক বিশাল শিবলিঙ্গ
উত্তর কলকাতার নিমতলা স্ট্রিটের এক সরু গলির ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে এই আটচালা স্থাপত্যের মন্দির। ১৭৯৪ সালে শোভাবাজারের হাটখোলা দত্ত বাড়ির (Hatkhola Dutta Family) সন্তান রসিকলাল ও জহরলাল দত্ত এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। সেখানে বিরাজ করছেন প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট উচ্চতার এক বিশাল শিবলিঙ্গ। কষ্টিপাথরের তৈরি এই লিঙ্গটি এতই বড় যে, তাঁর মাথায় জল ঢালতে বা আবির দিতে গেলে লোহার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। আর এই বিশালাকার চেহারার জন্যই ভক্তদের কাছে তিনি ‘মোটা মহাদেব’।
শিকলে বন্দি ভগবান! এক শিহরণ জাগানো রহস্য
এই মন্দিরকে ঘিরে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে এক অদ্ভুত রহস্য। শোনা যায়, অতীতে এই বিশাল শিবলিঙ্গকে নাকি লোহার মোটা শিকল (Chains) দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। লোককথা অনুযায়ী, এই শিবলিঙ্গ নাকি একসময় নিজে থেকেই জায়গা পরিবর্তন করত বা গঙ্গার দিকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করত। সেই ‘চঞ্চলতা’ আটকাতেই তাঁকে শিকলবন্দি করার প্রথা ছিল। যদিও বর্তমানে সেই শিকল দেখা যায় না, তবে মন্দিরের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা সেই রহস্য আজও ভক্তদের আকর্ষণ করে।
‘মোটা মহাদেব’-এর রঙিন দোল: এক অপ্রচলিত আধ্যাত্মিকতা
কলকাতার দোল বলতেই আমাদের মাথায় আসে শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব বা বড়বাজারের হুল্লোড়। কিন্তু এই প্রাচীন মন্দিরে দোলের সকালে এক অন্য দৃশ্য চোখে পড়ে।
আবিরে রাঙা মহাদেব: দোলের দিন কাকভোরে মঙ্গলারতির পর শুরু হয় মহাদেবের অভিষেক। এরপর ভক্তরা সিঁড়ি বেয়ে উঠে বিশাল শিবলিঙ্গের গায়ে গোলাপি, নীল আর হলুদ আবির (Gulaal) মাখিয়ে দেন।
ভক্তি আর ধ্বনি: পুরো মন্দির চত্বর তখন ‘হর হর মহাদেব’ (Har Har Mahadev) এবং ‘জয় ভোলেনাথ’ (Jai Bholenath) ধ্বনিতে গমগম করে।
আধ্যাত্মিক হোলি: ভক্তদের বিশ্বাস, এই দিন মহাদেবকে আবির ছোঁয়ালে জীবনের সমস্ত কলুষতা মুছে যায়। শিবের রুদ্র রূপ এখানে যেন এক পরম শান্ত ও রঙিন রূপ ধারণ করে।
আসন্ন দোলে আপনার গন্তব্য হতে পারে উত্তর কলকাতা
সামনেই দোল উৎসব। আপনি যদি গতানুগতিক রঙের উৎসবের বাইরে বেরিয়ে কলকাতার বুক থেকে হারিয়ে যাওয়া কোনো ঐতিহ্যকে ছুঁতে চান, তবে এবার আপনার গন্তব্য হোক এই ‘মোটা মহাদেব’ মন্দির। মন্দিরের দেওয়ালে ঝুলে থাকা বটের ঝুরি আর প্রাচীন টেরাকোটার (Terracotta) কাজ আপনাকে এক লহমায় নিয়ে যাবে কয়েকশো বছর আগের কলকাতায়। গঙ্গার হিমেল হাওয়ায় আবির মাখা মহাদেবের দর্শন আপনার উৎসবকে এক অন্য মাত্রা দেবে।
কীভাবে যাবেন?
শোভাবাজার মেট্রো থেকে অটোয় আহিরীটোলা (Ahiritola) লঞ্চ ঘাট বা নিমতলা শ্মশান সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছে যে কাউকে বললেই দেখিয়ে দেবে এই প্রাচীন মন্দির। প্রতিদিন ভোর ৪:৩০ থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকেল ৪টে থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে।

