আ মরি বাংলা ভাষা, নিউজস্কোপ-এর বিশেষ নিবেদন
তপোব্রত ঘোষ
বাংলা ভাষার মাধুর্য তার ব্যাকরণে যত না, তার চেয়েও বেশি তার কথোপকথনে। বিশেষ করে রাঢ় বাংলার সহজ, টানটান, আদুরে উচ্চারণে প্রশ্ন আর উত্তরের ভেতরেই গড়ে ওঠে সম্পর্কের সেতু। এখানে প্রশ্ন মানেই জোর নয় যত্ন। উত্তর মানেই তথ্য নয়—আবেগের স্পর্শ।
আমরা প্রতিদিনই কত সাধারণ প্রশ্ন করি, অথচ তার ভেতর লুকিয়ে থাকে অগাধ ভালোবাসা। যেমন—“কেমন আছো?” উত্তরে আসে, “ভালো আছি, তুমি কেমন?” এই আদানপ্রদানেই তৈরি হয় পারস্পরিক খোঁজখবরের উষ্ণতা। “খেয়েছো তো?”“হ্যাঁ, গো খেয়েছি। তুমি খেয়েছ?”এ যেন প্রেমের গন্ধ মিশে থাকা কথোপকথন। “বাড়ি পৌঁছেছ?”“হ্যাঁ, নিরাপদেই পৌঁছেছি, চিন্তা করো না”এখানে নিরাপত্তার আশ্বাসই আসল সুর।
আড্ডায় এই প্রশ্নোত্তর আরও প্রাণবন্ত। “কি রে, রাগ করেছিস নাকি?”
“না রে, একটু মন খারাপ ছিল।” “চা খাবে?”
“খাবো, তবে তোমার হাতে বানানো হলে!” “
কাল আসছ তো?”
“অবশ্যই, কথা দিয়েছি যখন।” “মন খারাপ?”
“তুমি আছ তো, কেটে যাবে।” ছোট ছোট প্রশ্ন, কিন্তু উত্তরগুলো সম্পর্ককে আরও গাঢ় করে তোলে।
আমাদের সাহিত্যও এই প্রশ্নোত্তরের মাধুর্যে সমৃদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর রচনায় “যাবে?”“যাবো, যদি ডাকো”এর মতো সংলাপে আছে টান আর প্রত্যাশা। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর উপন্যাসে “আমায় ভুলবে না তো?”“ভুলব কী করে?”এই সহজ উত্তরেই ধরা পড়ে গভীর আবেগ। প্রশ্ন যেন ভালোবাসার দরজা খোলে, আর উত্তর সেই দরজায় আলো জ্বালে।
“এত চুপ কেন?”
“তোমার কথাই ভাবছিলাম।”
“আমায় মনে পড়ে?”
“রোজই পড়ে।”
“সাবধানে যাবে তো?”
“তোমার কথা মাথায় রেখেই যাব।”
“অপেক্ষা করছিলে?”
“হ্যাঁ, অনেকক্ষণ ধরে।”
“ভরসা আছে আমার ওপর?”“অগাধ।”
“কষ্ট পেয়েছ?”
“একটু, তবে তুমি পাশে আছ।”
“আবার দেখা হবে তো?”
“খুব শিগগিরই।”
“ভালোবাসো?”
“খুব, ভীষণ।”
এইসব পেলবতা বাংলা ভাষার প্রাণ। এখানে শব্দ বড় নয়, আবেগ বড়। বাংলা কথায় একটু আদর, একটু খুনসুটি, একটু নিশ্চিন্ত আশ্বাস সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক মিষ্টি সুর।
বাংলা ভাষাকে ভালোবাসা মানে কেবল শুদ্ধ উচ্চারণ নয়; বরং প্রতিটি প্রশ্নে যত্ন আর প্রতিটি উত্তরে আন্তরিকতা রাখা। যদি আমরা প্রতিদিন জিজ্ঞেস করি“ভালো আছ তো?” এবং মন দিয়ে উত্তর দিই
“তোমার জন্যই ভালো”তবেই বাংলা তার প্রকৃত সৌন্দর্যে বেঁচে থাকবে, আমাদের সম্পর্কের ভাঁজে ভাঁজে।

