ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে সেনাপ্রধানদের স্মৃতিকথা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়, কিন্তু জেনারেল এম.এম. নরবণে-র অপ্রকাশিত বই ‘ফোর স্টারস অফ ডেসটিনি’ ঘিরে যে নজিরবিহীন সংঘাত শুরু হয়েছে, তা দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং রাজ্যসভায় মল্লিকার্জুন খাড়গে এই বইয়ের অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে মোদী সরকারকে বিদ্ধ করতেই শাসক পক্ষ যে মরিয়া প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তা সন্দেহাতীতভাবেই ইঙ্গিত দেয় যে বইটির ছত্রে ছত্রে এমন কিছু সত্য লুকিয়ে আছে যা বর্তমান সরকারের জন্য অস্বস্তিকর।
২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষ এবং পূর্ব লাদাখে চিনা আগ্রাসনের সময় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (LAC) ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে সরকারের বয়ান এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে ফারাক দীর্ঘদিনের বিতর্কের বিষয়। জেনারেল নরবণে তাঁর বইয়ে (যা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অংশ থেকে জানা যাচ্ছে) দাবি করেছেন যে, ২০২০-র অগাস্টে যখন চিনা ট্যাঙ্ক ভারতীয় ভূখণ্ডের দিকে এগোচ্ছিল, তখন দিল্লির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে কোনো স্পষ্ট নির্দেশিকা মেলেনি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পক্ষ থেকে নাকি কেবল বলা হয়েছিল ‘জো উচিত সমঝো, ওহি করো’ (যা সঠিক মনে হয়, তাই করো)।

বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে সংকটের মুহূর্তে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ ছিল এবং দায়ভার সেনার ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজে হাত ধুয়ে ফেলতে চেয়েছিল। একজন সেনাপ্রধান যখন চূড়ান্ত নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করেন, তখন ‘যা ইচ্ছা করো’ বলা দায়িত্ব এড়ানোরই নামান্তর ।
বইটিতে কেবল সীমান্ত সংঘাত নয়, বিতর্কিত ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্প নিয়েও বিস্ফোরক তথ্য রয়েছে বলে জানা গেছে। নরবণে-র মতে, এই প্রকল্পটি সেনার কাছে ছিল ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’-এর মতো। নৌসেনা এবং বায়ুসেনাকে অন্ধকারে রেখেই নাকি এটি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যদি এই দাবি সত্য হয়, তবে তা মোদী সরকারের একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি এবং দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর তার নেতিবাচক প্রভাবকেই প্রকাশ্যে আনে।
সরকারের অবস্থান ও গণতান্ত্রিক অধিকার
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সংসদে দাবি করেছেন যে, বইটি যেহেতু সরকারিভাবে প্রকাশিত হয়নি, তাই এর তথ্যকে প্রামাণ্য হিসেবে ধরা যাবে না। জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ছাড়পত্রের অপেক্ষায় ফেলে রাখা কি কেবলই পদ্ধতিগত বিলম্ব, নাকি সত্য দমনের কৌশল? সংসদীয় বিধি (রুল ৩৪৯) ব্যবহার করে বিরোধীদের মুখ বন্ধ করা হলেও জনমানসে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে সরকার যদি আত্মবিশ্বাসী হয় যে সীমান্তে ‘এক ইঞ্চি জমিও খোয়া যায়নি’, তবে একজন প্রাক্তন সেনাপ্রধানের বয়ানকে তারা ভয় পাচ্ছে কেন?
জাতীয় নিরাপত্তা অবশ্যই অগ্রাধিকারের বিষয়, কিন্তু তার আড়ালে রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকা দেওয়া কোনো সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ হতে পারে না। জেনারেল নরবণে-র বই নিয়ে এই লুকোচুরি শেষ পর্যন্ত মোদী সরকারের ‘স্ট্রংম্যান’ ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। সত্যকে আটকে রাখা যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না।



Recent Comments