মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা আর শুধু আন্তর্জাতিক খবরের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, তার সরাসরি প্রভাব এসে পড়েছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে। ইরান (Iran) এবং ইজরায়েল (Israel)-এর মধ্যে ক্রমশ বাড়তে থাকা যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে এবার কোপ পড়ল সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে। জানা গিয়েছে, গ্রাহকদের এলপিজি ডবল সিলিন্ডারের নতুন সংযোগ দেওয়া আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরবরাহকারী তেল সংস্থাগুলি। আন্তর্জাতিক স্তরে জ্বালানি সরবরাহে যে বড়সড় সংকটের মেঘ ঘনিয়েছে, এটি তারই প্রাথমিক পূর্বাভাস বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
কেন বন্ধ ডবল সিলিন্ডারের কানেকশন?
সম্প্রতি এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে তেল সংস্থাগুলির তরফে একটি বিশেষ নির্দেশিকা এসে পৌঁছেছে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আপাতত কোনও গ্রাহক যদি দ্বিতীয় সিলিন্ডার বা ডবল কানেকশনের জন্য আবেদন করেন, তবে তা মঞ্জুর করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ হলো গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন জোগান বজায় রাখা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সাপ্লাই চেনে যাতে কোনওভাবেই বড় বিপর্যয় নেমে না আসে, তা নিশ্চিত করতেই এই আগাম সতর্কতা। ফলে, যে সমস্ত গ্রাহকের বাড়িতে বর্তমানে একটি মাত্র সিলিন্ডার রয়েছে, আগামী বেশ কিছুদিন তাঁদের সেটি দিয়েই কাজ চালাতে হবে। গ্যাস ডিলারদের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে এখনও অনেকটাই সময় লাগতে পারে।
আমদানিতে কোপ এবং হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব
ভারতের (India) মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে রান্নার গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই মেটানো হয় আমদানির মাধ্যমে। আর এই আমদানির সিংহভাগই আসে উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হলো হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz)। তেল ও গ্যাসবাহী অধিকাংশ জাহাজ এই পথ দিয়েই ভারতে প্রবেশ করে।
কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অপরিশোধিত তেল বা এলএনজির তুলনায় রান্নার গ্যাসের উৎস এবং মজুত, দুই-ই বিশ্বে তুলনামূলকভাবে বেশ কম। তাই জাহাজ চলাচলে এই বিঘ্ন ঘটলে ভারতের বাজারে সরাসরি তার প্রভাব পড়াটা খুবই স্বাভাবিক।
আতঙ্কিত হয়ে মজুত নয়, আবেদন সরকারের
সরকারি সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩০ দিনের এলপিজি মজুত রয়েছে। কিন্তু মুশকিল হলো সাধারণ মানুষের অহেতুক আতঙ্ক। নির্ধারিত সময়ে জাহাজ না পৌঁছানোর খবর চাউর হতেই অনেকেই আগেভাগে অতিরিক্ত সিলিন্ডার বুকিং শুরু করে দিয়েছেন।
বিভিন্ন শহরের ডিস্ট্রিবিউটররা জানিয়েছেন যে, এই প্যানিক বুকিংয়ের ফলে মজুত থাকা সিলিন্ডার দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের তরফ থেকে সাধারণ মানুষকে অহেতুক আতঙ্কিত না হওয়ার এবং বাড়িতে অতিরিক্ত সিলিন্ডার মজুত না করার জন্য বারবার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
গুজবে ভিড় বাড়ছে পেট্রল পাম্পেও
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শুধু রান্নার গ্যাস নয়, প্রভাব পড়েছে গাড়ির জ্বালানির ক্ষেত্রেও। সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্রমাগত তেলের দাম বৃদ্ধির নানা গুজব ছড়াচ্ছে। এর ফলে পেট্রল পাম্পগুলোতেও সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দাম বাড়ার আতঙ্কে অনেকেই গাড়ির ট্যাঙ্ক পুরোপুরি ভর্তি করে নিচ্ছেন।
তবে এই প্রসঙ্গে ওয়েস্ট বেঙ্গল পেট্রল ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (West Bengal Petrol Dealers Association)-এর সভাপতি অরুণ সিংঘানিয়া (Arun Singhania) সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, “এই মুহূর্তে তেলের জোগান কমে যাওয়ার মতো কোনও পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তাই এখনই অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই।” তবে তিনি এও মেনে নিয়েছেন যে, যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্বালানির দামে কিছুটা হেরফের হতে পারে।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে এটা স্পষ্ট যে, আন্তর্জাতিক আঙিনায় চলা এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত আমাদের অর্থনীতি এবং প্রাত্যহিক জীবনের ওপর একটা বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এই সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর সকলের।
