মধ্যপ্রাচ্যের (Middle East) যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমশই এক ভয়াবহ এবং অনিশ্চিত রূপ নিচ্ছে। গোটা বিশ্ব যখন উদ্বেগের সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্তের খবর রাখছে, ঠিক তখনই এক অভাবনীয় ও রক্তহিম করা উদ্ধারকাজের সাক্ষী থাকল আন্তর্জাতিক মহল। শত্রুদেশ ইরান (Iran) ভূখণ্ডে ভেঙে পড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (United States of America) এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল (F-15E Strike Eagle) যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ দ্বিতীয় পাইলটকে অবশেষে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করল মার্কিন সামরিক বাহিনী। শত্রুপক্ষের দুর্গম পাহাড়ি ডেরায় টানা দু’দিন লুকিয়ে থাকার পর, তুমুল গোলাগুলির শেষে তাঁকে নিরাপদে বের করে আনা সম্ভব হয়েছে। এই দুঃসাহসিক অভিযান হলিউডের যেকোনো থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানাবে।
আল জাজিরা (Al Jazeera) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা গিয়েছে, শুক্রবার ইরানের খুজেস্তান (Khuzestan) প্রদেশের একটি অত্যন্ত দুর্গম অঞ্চলে আমেরিকার ওই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হয়। হামলার পর বিমানে থাকা দুই ক্রু সদস্য প্যারাস্যুটের সাহায্যে নিচে নামতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রথম পাইলটকে শুক্রবারই উদ্ধার করেছিল আমেরিকান কমান্ডোরা। কিন্তু দ্বিতীয় জন, যিনি একজন উচ্চপদস্থ কর্নেল এবং বিমানের অস্ত্র ব্যবস্থা আধিকারিক (Weapons System Officer), তিনি সেই গোলমালের মধ্যে নিখোঁজ হয়ে যান। এরপরই শুরু হয় তাঁকে খোঁজার এক রুদ্ধশ্বাস স্নায়ুযুদ্ধ, যা কার্যত ঘুম কেড়ে নিয়েছিল ওয়াশিংটনের।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) রবিবার গভীর রাতে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এই অভাবনীয় সাফল্যের খবর নিশ্চিত করেছেন। চরম উচ্ছ্বসিত প্রেসিডেন্ট তাঁর বার্তায় লেখেন, “আমরা তাঁকে পেয়েছি!” ট্রাম্প গর্বের সঙ্গে জানান, “এটি আমাদের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক একটি উদ্ধার অভিযান। আমাদের অবিশ্বাস্য এবং অত্যন্ত সম্মানিত এক কর্নেলকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।” তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে আরও বলেন যে, ওই আধিকারিক সামান্য আহত হলেও তিনি নিরাপদ এবং দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন।উদ্ধার অভিযানের নেপথ্যের কাহিনী গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো।
একদিকে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডোরা যখন নিজেদের হারানো পাইলটকে খুঁজছে, অন্যদিকে ইরানি সেনাও তাঁকে বন্দি করার জন্য মরিয়া হয়ে চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছিল। পরিস্থিতি এতটাই জটিল ছিল যে, তেহরান (Tehran) ওই পাইলটকে জীবন্ত ধরার জন্য ৬০,০০০ ডলারের বিশাল পুরস্কার ঘোষণা করে বসে। এমনকি সেদেশের সরকারি টেলিভিশনে বারবার প্রচার করে স্থানীয় বাসিন্দাদের নির্দেশ দেওয়া হয়, তাঁকে দেখামাত্র যেন প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু মার্কিন সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (CIA) এবং পেন্টাগন (Pentagon) যৌথভাবে এক মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে মার্কিন সেনাকে সাহায্য করে।জানা গিয়েছে, সিআইএ প্রথমে ইরানিদের বিভ্রান্ত করার জন্য অত্যন্ত সুকৌশলে একটি গুজব ছড়ায় যে, পাইলটকে আগেই উদ্ধার করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই ভুল তথ্যের কারণে শত্রুপক্ষ যখন বিভ্রান্ত, তখন আকাশে কড়া নজরদারি চালাচ্ছিল আমেরিকার ডজন ডজন যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং সি-১৩০ (C-130) হারকিউলিস বিমান। অবশেষে শনিবার রাতের অন্ধকারে পাহাড়ের একটি খাঁজে নিখোঁজ পাইলটের অবস্থান নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁকে উদ্ধার করতে স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের জওয়ানরা নামলে ইরানি সেনার সঙ্গে তাদের প্রচণ্ড গোলাগুলি (Heavy Firefight) শুরু হয়।আমেরিকার যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথ (Pete Hegseth) এবং জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান ড্যান কেইন (Dan Caine) ওয়াশিংটনে বসে পুরো বিষয়টির ওপর ২৪ ঘণ্টা কড়া নজর রাখছিলেন।
রাতের অন্ধকারে অত্যন্ত নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারগুলিকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি চালিয়েছিল ইরানি বাহিনী। তবে কমান্ডোরা ভারী বিমান হামলার কভার ফায়ারের সাহায্যে এবং নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সমস্ত বাধা অতিক্রম করে। অবশেষে সেই পাইলটকে নিয়ে নিরাপদে নিজেদের ঘাঁটিতে ফেরে তারা। প্রাক্তন সেনাকর্মী ও সাংবাদিক জ্যাক মার্ফি (Jack Murphy) জানিয়েছেন, পাইলটটি নিজে থেকেও পালানোর চেষ্টা করছিলেন এবং তাঁর বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাই তাঁকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে শত্রুর দেশের এতটা গভীরে ঢুকে পরপর দু’জন পাইলটকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে উদ্ধার করার ঘটনা সত্যিই নজিরবিহীন। ট্রাম্প এই প্রসঙ্গে জোর গলায় বলেছেন, “আমরা কখনোই আমাদের কোনো যোদ্ধাকে শত্রুর মাটিতে ফেলে আসি না।” এই সফল এবং রুদ্ধশ্বাস অভিযানের পর দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা যে আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।


Recent Comments