সংসদে ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ বা নারী সংরক্ষণ বিল পাশ হওয়ার পর ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। যদিও জনগণনা এবং ডিলিমিটেশন বা সীমানা পুনর্বিন্যাসের কারণে এই বিল এখনই আইনিভাবে কার্যকর হচ্ছে না, তবে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের উপরেই মহিলাদের অধিক সংখ্যায় প্রার্থী করার এক অলিখিত চাপ ও নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন দলের সাম্প্রতিক প্রার্থী তালিকা এবং রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে মহিলাদের প্রতিনিধিত্বের একটি স্পষ্ট চিত্র উঠে আসে।
পরিসংখ্যানের আয়নায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল
আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং বিগত কয়েকটি বড় নির্বাচনের (যেমন ২০২৪ সালের লোকসভা ও ২০২১ সালের বিধানসভা) টিকিটের হিসেব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে দলগুলির মধ্যে তারতম্য রয়েছে:
নারী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেস ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে রয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তারা ৪১% মহিলা প্রার্থী দিয়ে নজির গড়েছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তা কিছুটা কমে ২৮.৫% (৪২টি আসনের মধ্যে ১২টিতে মহিলা প্রার্থী) হলেও, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনেও তারা ৩৩%-এর বেশি মহিলা প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোচ্ছে। দলের টিকিট বন্টনে মহিলা মুখ বরাবরই অগ্রাধিকার পায়।
জাতীয় স্তরে নারী সংরক্ষণ বিল পাশের মূল কৃতিত্ব বিজেপির হলেও, পশ্চিমবঙ্গে তাদের প্রার্থী তালিকায় মহিলাদের হার সাধারণত ১৫% থেকে ২০%-এর মধ্যে থাকে। বিগত লোকসভায় তারা ৪২টি আসনের মধ্যে ৭ জন মহিলাকে (প্রায় ১৬.৬%) প্রার্থী করেছিল। আসন্ন বিধানসভা ভোটে এই সংখ্যা বাড়ানোর দিকে তারা জোর দিচ্ছে।
বামফ্রন্ট সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলিতে তরুণ প্রজন্মের নারী মুখ, বিশেষত ছাত্র ও যুব নেত্রীদের প্রার্থী করার ক্ষেত্রে জোর দিচ্ছে। তবে সার্বিকভাবে তাদের প্রার্থী তালিকায় মহিলাদের হার এখনও ২০% থেকে ২২%-এর আশেপাশেই ঘোরাফেরা করে।
নেতা-নেত্রীদের প্রাসঙ্গিক উক্তি
রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের মতো করে নারী ক্ষমতায়নের ব্যাখ্যা দিচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কথায় সেই দৃষ্টিভঙ্গিই প্রকট হয়ে ঊঠেছে।
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি সুপরিচিত মন্তব্য এই প্রসঙ্গে বারবার উঠে আসে— “দিল্লিতে বসে বিল পাশ করার অনেক আগে থেকেই বাংলায় আমরা মহিলাদের অধিকার দিয়েছি। সংরক্ষণের আইন কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায় আমরা বসে নেই, আমাদের দলে এমনিতেই ৩৩ শতাংশের বেশি মহিলা জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। নারী ক্ষমতায়নে বাংলা গোটা দেশকে পথ দেখায়।”
নারী সংরক্ষণ বিলের কৃতিত্ব তুলে ধরে রাজ্য বিজেপির এক শীর্ষ নেত্রীর কথায়— “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজির প্রবল সদিচ্ছাতেই দীর্ঘদিনের আটকে থাকা নারী সংরক্ষণ বিল আজ বাস্তব। আমরা শুধু সংখ্যাতত্ত্বের জন্য প্রতীকী প্রার্থী দিই না। স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে মহিলাদের টিকিট দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁরা মানুষের বিপুল সমর্থনও পাচ্ছেন।”
বাম শিবিরের এক প্রবীণ নেত্রীর কথায়— “শুধুমাত্র প্রার্থী তালিকায় নাম তোলাই নারী ক্ষমতায়ন নয়। কর্পোরেট ধাঁচে রাজনীতি না করে, যে মহিলারা রাস্তায় নেমে মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা এবং রুটিরুজির লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, বামপন্থী তালিকায় তাঁরাই অগ্রাধিকার পাচ্ছেন।”
নারী সংরক্ষণ বিল একটি বড় মাপের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেললেও, টিকিট বন্টনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলির প্রধান মাপকাঠি এখনও ‘জয়ের সম্ভাবনা’ বা ‘উইনেবিলিটি’ (Winnability)। তৃণমূল কংগ্রেস মহিলাদের প্রার্থী করার ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানগত দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও, অন্যান্য দলগুলিও এই ব্যবধান ঘোচাতে সচেষ্ট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রার্থী তালিকায় মহিলাদের নাম থাকলেই হবে না, পঞ্চায়েত থেকে বিধানসভা—প্রতিটি স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় (Decision-making process) মহিলাদের স্বাধীন ও জোরালো উপস্থিতি নিশ্চিত করাই হল প্রকৃত নারী ক্ষমতায়ন। আগামী নির্বাচনে বাংলার মহিলারা শুধু ভোটার হিসেবে নয়, প্রার্থী এবং নীতিনির্ধারক হিসেবেও কতটা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেন, সেটাই এখন দেখার।


Recent Comments