ভারতের (India) রাজনীতিতে বরাবরই অন্যতম চর্চিত রাজ্য হলো বিহার (Bihar)। আর এবার সেখানকার রাজনৈতিক আঙিনায় এক অভূতপূর্ব রদবদল ঘটতে চলেছে। যাবতীয় জল্পনা এবং গুঞ্জনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর (Chief Minister) পদ ছাড়ার কথা ঘোষণা করলেন খোদ জনতা দল ইউনাইটেড বা জেডিইউ (JDU) সুপ্রিমো নীতীশ কুমার (Nitish Kumar)। শুধু পদ ছাড়ছেন এমনটাই নয়, তিনি যে এবার রাজ্যসভায় (Rajya Sabha) যাচ্ছেন, সেই কথাও নিজের মুখে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক। তাঁর এই ঘোষণার পর থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
বেশ কিছুদিন ধরেই বিহারের রাজনৈতিক অলিন্দে ফিসফাস চলছিল নীতীশ কুমারের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে। অনেকেই মনে করছিলেন, তিনি হয়তো দিল্লির রাজনীতিতে আরও বেশি করে সক্রিয় হতে চাইছেন এবং রাজ্যের ভার অন্য কারও হাতে তুলে দিতে চাইছেন। অবশেষে সেই জল্পনাই সত্যি প্রমাণিত হলো। সম্প্রতি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া (Social Media) হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট করে এই প্রবীণ নেতা জানিয়েছেন, সংসদের দুই কক্ষের প্রতিনিধি হওয়া তাঁর বহুদিনের লালিত একটি ইচ্ছা ছিল। আর এবার নিজের সেই সুপ্ত ইচ্ছাই তিনি পূরণ করতে চলেছেন। তাঁর এই কথার সোজা অর্থ হলো, সদ্য নির্বাচিত হওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথাতেই বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বদল হতে চলেছে।
নীতীশের এই পদত্যাগের ঘোষণার পরেই সবথেকে বেশি যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হলো— এবার কে বসবেন বিহারের মসনদে? রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এবার হয়তো রাজ্যের কুরসিতে বসতে পারে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির (BJP) কোনও প্রথম সারির নেতা। উল্লেখ্য, দেশের স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত পাটলিপুত্রে (Pataliputra) গেরুয়া শিবিরের কেউ এককভাবে মুখ্যমন্ত্রী পদে বসেননি। দীর্ঘদিন ধরেই এই রাজ্যের শাসকদলের কুর্সির দিকে নজর ছিল তাদের। কিন্তু জোট সমীকরণের কারণে বারবার নীতীশকেই সেই পদ ছেড়ে দিতে হয়েছে। এবার তিনি নিজে থেকেই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিজেপির সেই দীর্ঘদিনের অধরা স্বপ্নপূরণ হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, নীতীশের এই পদক্ষেপকে ঘিরে দলের অন্দরেও তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ। জল্পনা চলছে, দলের শীর্ষনেতা যদি দিল্লির রাজনীতিতে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন, তবে রাজ্যে দলের হাল কে ধরবেন? এক্ষেত্রে তাঁর ছেলে নিশান্ত কুমারের (Nishant Kumar) নামও বারবার উঠে আসছে। অনেকেই মনে করছেন, নীতীশ রাজ্যসভায় চলে গেলে নিশান্তকে হয়তো রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী বা গুরুত্বপূর্ণ কোনও পদে বসানো হতে পারে। যদিও জেডিইউ বরাবরই পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলে এসেছে, কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলের রাশ নিজেদের হাতে রাখতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।
নীতীশ কুমারের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে দেখা যাবে, তিনি বরাবরই চমক দিতে ভালোবাসেন। বিরোধীরা তাঁকে বারবার ‘পালটুবাবু’ বলে কটাক্ষ করলেও, বিহারের রাজনীতিতে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা কখনই ফুরিয়ে যায়নি। জোট ভাঙা এবং গড়ার খেলায় তিনি যে কতটা সিদ্ধহস্ত, তা দেশের মানুষ বারবার দেখেছে। তবে এবার তিনি যা করলেন, তা তাঁর আগের সমস্ত রাজনৈতিক চালকে ছাপিয়ে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর মতো এমন একটি ক্ষমতাশালী এবং সম্মানজনক পদ স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন যে, তাঁর লক্ষ্য এখন শুধুই রাজ্য নয়, বরং জাতীয় স্তরের রাজনীতিতে একটি বড় ভূমিকা পালন করা।
বিজেপি শিবিরের জন্য এটি একটি অত্যন্ত বড় সুযোগ। বিহারে নিজেদের একজন মুখ্যমন্ত্রী বসাতে পারলে, তা গেরুয়া শিবিরের জন্য এক বিরাট রাজনৈতিক জয় বলে বিবেচিত হবে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই এই নিয়ে রণকৌশল সাজাতে শুরু করেছে বলে খবর। রাজ্য স্তরের নেতাদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও নজর রাখছে পাটনার (Patna) প্রতি মুহূর্তের রাজনৈতিক গতিবিধির ওপর।
সব মিলিয়ে, আগামী কয়েক সপ্তাহ বিহারের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। কে হবেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী, জেডিইউ এবং বিজেপির জোট সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেবে, আর নীতীশ কুমার রাজ্যসভায় গিয়ে কীভাবে বিরোধী শিবিরের মোকাবিলা করবেন— এই সব প্রশ্নের উত্তর পেতে এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
