মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক নতুন ভোরের অপেক্ষা। দীর্ঘ ৫২ বছর পর আবারও মানুষের পায়ের ছাপ না হলেও, মানুষের উপস্থিতি অনুভব করতে চলেছে চাঁদের রুপোলি রেখা। আমেরিকার (USA) মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) তাদের মেগা প্রজেক্ট ‘আর্টেমিস ২’ (Artemis II)-এর মাধ্যমে সেই অসাধ্য সাধনের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। সংস্থার এক্সপ্লোরেশন সিস্টেম ডেভেলপমেন্ট (Exploration Systems Development) প্রধান লরি গ্লেজ (Lori Glaze) স্পষ্ট জানিয়েছেন, কয়েক দশকের অপেক্ষা এবার বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে।
কবে এবং কীভাবে এই যাত্রা?
আগামী ৬ মার্চ (March 6) ফ্লোরিডার (Florida) কেনেডি স্পেস সেন্টার (Kennedy Space Center) থেকে চার মহাকাশচারীকে নিয়ে গর্জে উঠবে বিশ্বের সবথেকে শক্তিশালী রকেট স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (Space Launch System – SLS)। ৩২২ ফুটের এই দানবীয় রকেটের মাথায় সওয়ার হয়ে ওরিয়ন (Orion) মহাকাশযানে চেপে মহাকাশচারীরা পাড়ি দেবেন গভীর অন্তরীক্ষে। এটি মূলত একটি ক্রুড লুনার ফ্লাইবাই (Crewed Lunar Flyby) মিশন। অর্থাৎ, মহাকাশচারীরা চাঁদে অবতরণ করবেন না, বরং চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণ করে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।
চাঁদের অনাবিষ্কৃত অংশে মানুষের চোখ
এই ১০ দিনের অভিযানে মহাকাশচারীরা চাঁদের সেই অংশে পৌঁছাবেন, যা পৃথিবী থেকে কখনও দেখা যায় না। চাঁদ থেকে প্রায় ৬,৫০০ থেকে ৯,৫০০ কিলোমিটার দূরত্ব বজায় রেখে তাঁরা পর্যবেক্ষণ চালাবেন। ওরিয়ন (Orion) মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লক্ষ কিলোমিটার দূরে পাড়ি দেবে, যা এর আগে কোনো মানববাহী যান করেনি। এরপর প্রশান্ত মহাসাগরে (Pacific Ocean) অবতরণের মাধ্যমে শেষ হবে এই রোমাঞ্চকর সফর।
কারা লিখছেন এই ইতিহাস?
এই অভিযানে অংশ নিচ্ছেন চারজন অভিজ্ঞ মহাকাশচারী:
১. রিড ওয়াইজম্যান (Reid Wiseman): কমান্ডার।
২. ভিক্টর গ্লোভার (Victor Glover): পাইলট (প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে চাঁদের পথে)।
৩. ক্রিস্টিনা কোচ (Christina Koch): মিশন স্পেশালিস্ট (প্রথম মহিলা হিসেবে চন্দ্র অভিযানে)।
৪. জেরেমি হ্যানসেন (Jeremy Hansen): কানাডার (Canada) প্রতিনিধি।
মহাকাশ সমীকরণে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
‘আর্টেমিস ২’ (Artemis II) কেবল একটি বিজ্ঞানভিত্তিক মিশন নয়, এটি বর্তমান ভূ-রাজনীতির (Geopolitics) এক বড় অস্ত্র। ১৯৭২ সালে ‘অ্যাপোলো ১৭’ (Apollo 17)-এর পর কেন এত দেরি? উত্তরটা লুকিয়ে আছে বর্তমান মহাকাশ প্রতিযোগিতায়। একদিকে চীন (China) ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ নামানোর লক্ষ্য নিয়েছে, অন্যদিকে রাশিয়া (Russia) ও ভারতও (India) চাঁদের দক্ষিণ মেরু নিয়ে অত্যন্ত আগ্রহী।বিশেষজ্ঞদের মতে, নাসা (NASA) চাইছে চীনের আগে চাঁদে একটি স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করতে। এই মিশনে আমেরিকা তাদের সহযোগী দেশগুলোর (যেমন কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সাথে নিয়ে চলছে, যা চীনের ‘ক্লোজড প্রোগ্রাম’ (Closed Program)-এর সম্পূর্ণ বিপরীত। স্পেস এক্স (SpaceX) এবং ব্লু অরিজিন (Blue Origin)-এর মতো বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও এই দৌড়ে সামিল করা হয়েছে, যা মহাকাশ অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
ভবিষ্যতের লক্ষ্য: মঙ্গল গ্রহ (Mars)
আর্টেমিস ২ (Artemis II) সফল হলে আর্টেমিস ৩ (Artemis III) মিশনের পথ প্রশস্ত হবে, যেখানে ২০২৭ সালের মধ্যে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সরাসরি মানুষ নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে। নাসা (NASA) মনে করে, চাঁদ হবে মঙ্গল (Mars) অভিযানের একটি ‘লঞ্চিং প্যাড’ বা সোপান।আপাতত ৬ মার্চের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে গোটা বিশ্ব।

