যেকোনো দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা মূলত নির্ভর করে তার নিরপেক্ষতা এবং অবিচল স্বচ্ছতার ওপর। সম্প্রতি ভারত (India) রাষ্ট্রের রাজধানী নয়াদিল্লিতে (New Delhi) অবস্থিত দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court) এমন একটি অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছে, যা বিচারবিভাগীয় স্বচ্ছতার ধারণাকে আরও কয়েক গুণ মজবুত করেছে। সুপ্রিম কোর্টের অন্যতম স্বনামধন্য বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথন (Justice K.V. Viswanathan) একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচারপ্রক্রিয়া থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নিয়েছেন। সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই মামলাটির শুনানি ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং আদালত রায় ঘোষণার জন্য তা সংরক্ষিতও করে রেখেছিল। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে কেন এমন অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি? আসুন, পুরো বিষয়টি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা যাক।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এই নির্দিষ্ট মামলাটি দায়ের করেছিল অ্যালকেমিস্ট অ্যাসেট রিকনস্ট্রাকশন কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (Alchemist Asset Reconstruction Company Private Limited)। মামলাটির চূড়ান্ত শুনানি চলছিল বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা (Justice J.B. Pardiwala) এবং বিচারপতি বিশ্বনাথনের ডিভিশন বেঞ্চে। গত ১৭ই মার্চ এই মামলার শুনানি শেষ হয় এবং নিয়ম অনুযায়ী দুই বিচারপতির বেঞ্চ রায়দান সাময়িকভাবে স্থগিত বা সংরক্ষিত (Reserved) রাখে। কিন্তু এরপরই ঘটে এক নাটকীয় মোড়।
রায় ঘোষণার আগে মামলার যাবতীয় নথিপত্র এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় গভীরভাবে খতিয়ে দেখার সময় বিচারপতি বিশ্বনাথনের নজরে আসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তিনি দেখতে পান যে, অতীতে যখন তিনি দেশের শীর্ষ আদালতে একজন আইনজীবী হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তখন তিনি এই একই মামলায় কর্পোরেট ইনসলভেন্সি রেজোলিউশন প্রসেস (Corporate Insolvency Resolution Process) বা সিআইআরপি-এর অধীনে প্রধান ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে আবেদনকারীর পক্ষে আইনি লড়াই লড়েছিলেন। অর্থাৎ, যে মামলায় তিনি আজ বিচারকের আসনে বসে চূড়ান্ত রায় দিতে চলেছেন, একসময় সেই মামলাতেই তিনি এক পক্ষের বেতনভুক্ত আইনজীবী হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
আইনি পরিভাষায় এই ধরনের পরিস্থিতিকে ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট’ (Conflict of Interest) বা স্বার্থের সংঘাত বলা হয়ে থাকে। একজন বিচারক হিসেবে ১০০ শতাংশ নিরপেক্ষতা বজায় রাখা আইনি ব্যবস্থার প্রথম শর্ত। তাই এই তথ্য নিজের গোচরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে মামলাটি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
গত ১লা এপ্রিল বেঞ্চের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় যে, যেহেতু বিচারপতি বিশ্বনাথন একসময় এই দেউলিয়া বিধি সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ায় আপিলকারীর কৌঁসুলি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে তিনি আর এই মামলার অংশ থাকবেন না। এর পরিপ্রেক্ষিতে, গত ১৭ই মার্চের যে নির্দেশে রায় সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল, তা তৎক্ষণাৎ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। বেঞ্চের তরফ থেকে দেশের প্রধান বিচারপতিকে (Chief Justice of India) বিনীত অনুরোধ করা হয়েছে যাতে তিনি এই মামলাটি নতুন করে অন্য কোনো উপযুক্ত বেঞ্চে স্থানান্তরিত করার নির্দেশ প্রদান করেন।
বিচারপতি বিশ্বনাথনের এই চরম পেশাদারিত্ব এবং সততা বর্তমানে সমগ্র আইনি মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ১৯শে মে তিনি সরাসরি বার (Bar) থেকে শীর্ষ আদালতের বিচারপতি হিসেবে সরাসরি উন্নীত হন। এর বেশ কয়েক বছর আগে, ২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে তাঁকে শীর্ষ আদালত কর্তৃক সিনিয়র অ্যাডভোকেট (Senior Advocate) হিসেবে বিশেষ স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছিল। বিচারপতি হওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং প্রথম সারির আইনজীবী হিসেবে আইনি মহলে সুপরিচিত ছিলেন।
এই পদক্ষেপটিকে আইনি পরিভাষায় ‘জুডিশিয়াল প্রোপাইটি’ বা বিচারিক শালীনতার এক বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। একজন বিচারকের অতীত জীবনের কোনো কাজ যেন তাঁর বর্তমান রায়কে প্রভাবিত করতে না পারে, অথবা সাধারণ মানুষের মনে বিন্দুমাত্র পক্ষপাতিত্বের সন্দেহ তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা বিচারকদেরই অন্যতম প্রধান নৈতিক দায়িত্ব। চাইলেই তিনি অতীতের সেই আইনি পেশার কথা হয়তো এড়িয়ে যেতে পারতেন, কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে স্বচ্ছ থাকতে এবং আদালতের গরিমা অক্ষুণ্ণ রাখতে তিনি যে সততার পরিচয় দিলেন, তা আগামী প্রজন্মের সমস্ত আইনজীবীদের কাছে একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে থাকবে।


Recent Comments