ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (Special Intensive Revision) থেকে নাম বাদ পড়া নিয়ে ভারত (India) জুড়ে যে প্রবল আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, তাতে বড়সড় স্বস্তি দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বুধবার সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) এক ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে কারও নাম বাদ যাওয়া মানেই তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল হওয়া নয়।
একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণ বৈধ এবং সংবিধানসম্মত বলেও সিলমোহর দিয়েছে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (Surya Kant) এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর (Joymalya Bagchi) বেঞ্চ।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষ করে বিহার (Bihar), পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal), কেরল (Kerala) এবং তামিলনাড়ুতে (Tamil Nadu) ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক চলছিল। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে কমিশন আদতে ঘুরপথে নাগরিকত্ব নির্ধারণের কাজ করছে। এটি সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল হতে পারে বলেও শীর্ষ আদালতে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়। কিন্তু বুধবার আদালত সেই সব অভিযোগ সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে। রায়ে পরিষ্কার বলা হয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে ভোটার তালিকা ত্রুটিমুক্ত করা কমিশনের সাংবিধানিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তাই এসআইআর প্রক্রিয়াটি কোনওভাবেই বেআইনি বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়।
তবে লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গাটি হল নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আদালতের নির্দেশ। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের কাজ শুধুমাত্র ভোটার তালিকায় নাম তোলার যোগ্যতা নির্ধারণ করা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। কারও নাগরিকত্ব আছে কি নেই, তা চূড়ান্তভাবে স্থির করার এক্তিয়ার বা আইনি ক্ষমতা কমিশনের নেই।
শীর্ষ আদালত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলেছে, “কমিশন তালিকা থেকে নাম বাদ দিতেই পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে ওই ব্যক্তি আর দেশের নাগরিক নন।” অর্থাৎ, ভোটার তালিকায় নাম না থাকলেও একজন ব্যক্তির নাগরিক অধিকার সঙ্গে সঙ্গে কেড়ে নেওয়া যাবে না। নাগরিকত্বের বিষয়টি সম্পূর্ণ অন্য একটি আইনি প্রক্রিয়ার আওতাভুক্ত।এখন সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, যাঁদের নাম নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহের কারণে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? এই বিষয়েও সুপ্রিম কোর্ট একটি নির্দিষ্ট রূপরেখা দিয়ে দিয়েছে।
আদালত কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে, তালিকা থেকে বাদ পড়া সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নাম আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের (Ministry of Home Affairs) উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হবে। এরপর নাগরিকত্ব আইন (Citizenship Act) অনুযায়ী সেই সব ব্যক্তির নাগরিকত্ব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী বিধানসভা বা পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগেই এই যাচাই প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যাচাইয়ের সময় ওই ব্যক্তিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে।
উপযুক্ত নথিপত্র ও প্রমাণ দেখাতে পারলে তাঁদের নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় সম্মানের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ (Article 324) এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইন (Representation of the People Act) অনুযায়ী, স্বচ্ছ নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করে আদালত।
শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, মৃত ব্যক্তি বা ভুয়ো ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন তালিকা তৈরির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা গণতন্ত্রের ভিতকে আরও মজবুত করবে। এসআইআর-এর সময় নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে জন্ম শংসাপত্র, জমির দলিল বা পাসপোর্টের পাশাপাশি আধার কার্ডও (Aadhaar Card) যে গ্রহণ করা যায়, সেই নির্দেশ আগেই দিয়েছিল আদালত, যা সাধারণ মানুষকে অনেকটাই স্বস্তি দিয়েছিল।


Recent Comments