রাজ্য রাজনীতির চরম ব্যস্ততা, লাগাতার দলীয় কর্মসূচি এবং বাকযুদ্ধের মাঝেই একেবারে অন্য এক রূপে ধরা দিলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। রাজনীতির জটিল ময়দানে তিনি যেমন অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এবং সোচ্চার, ঠিক তেমনই আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে তাঁর গভীর ভক্তি বারবার প্রকাশ্যে এসেছে। সম্প্রতি তাঁকে একটি সুসজ্জিত গোশালায় গিয়ে সম্পূর্ণ ভক্তিভরে গো-সেবা (Cow worship) করতে দেখা গেল। এই পবিত্র ঘটনার একাধিক ছবি ও ভিডিও ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ভারত (India) তথা বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) রাজ্যের বিস্তীর্ণ গ্রামীণ ও শহরতলির সংস্কৃতিতে গো-মাতার এক বিশেষ এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধার স্থান রয়েছে। সেই সুপ্রাচীন ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় ভাবাবেগ মেনেই তিনি এদিন এই পবিত্র কাজে অংশ নিয়েছেন।
এদিন সকালে একটি স্থানীয় ও সুপরিচিত গোশালায় হঠাৎই উপস্থিত হন তিনি। সেখানে গিয়ে প্রথমেই তিনি গোশালার কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তারপর নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে গো-মাতার আরাধনা শুরু করেন। উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে শুভেন্দু একটি পিতলের পাত্রে বিশুদ্ধ জল নিয়ে নিজের হাতে গো-মাতার পা ধুইয়ে দেন। সনাতন ধর্ম (Sanatan Dharma) অনুসারে হিন্দু শাস্ত্রে গরুকে মাতৃজ্ঞানে পুজো করার বিধান রয়েছে, আর সেই রীতিনীতি অক্ষরে অক্ষরে মেনেই তিনি এই কাজ করেছেন।
পা ধোয়ানোর পর একটি পরিষ্কার ও নরম বস্ত্র দিয়ে তিনি সযত্নে তা মুছিয়েও দেন। এরপর তিনি নিজের হাতে তাজা সবুজ ঘাস, পুষ্টিকর গুড়, ফল এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর খাবার গো-মাতাকে পরম মমতায় খাওয়ান। সেই সময় তাঁর চোখে-মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এবং গভীর ভক্তিভাব লক্ষ্য করা গিয়েছে। কলকাতা (Kolkata) এবং মেদিনীপুর (Medinipur) সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ তাঁর এই মাটির কাছাকাছি থাকার মানসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করছেন।
তবে শুধু পা ধোয়ানো বা খাবার খাওয়ানোতেই তিনি নিজের সেবাকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। এরপর উপস্থিত পুরোহিতদের বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে দিয়ে তিনি গো-মাতার কপালে চন্দন, হলুদ ও সিঁদুরের পবিত্র তিলক পরিয়ে দেন। এরপর পুষ্পমাল্য অর্পণ করে প্রদীপ প্রজ্বলন করেন এবং অত্যন্ত ভক্তিভরে আরতিও করেন। আরতির সময় তাঁকে বেশ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে একাগ্রচিত্তে প্রার্থনা করতে দেখা যায়।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, নিঃস্বার্থভাবে গো-সেবা করলে অপার পুণ্য লাভ হয়, গ্রহের দোষ খণ্ডন হয় এবং জীবনের সমস্ত বাধা বিপত্তি দূর হয়ে সুখ ও সমৃদ্ধি আসে। বিজেপি (BJP) দলের একজন প্রথম সারির প্রভাবশালী নেতা হিসেবে তাঁর এই ধরনের সনাতনী এবং পারম্পরিক কার্যকলাপে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এই বিরল ঘটনার ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই নেটদুনিয়ায় চর্চা ও আলোচনা একেবারে তুঙ্গে উঠেছে। একদিকে তাঁর অনুগামী ও দলীয় কর্মীরা এই কাজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অনেকেই মন্তব্য করেছেন যে, তিনি একজন সত্যিকারের মাটির মানুষ এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেও নিজের শিকড় ও সংস্কৃতিকে কখনও ভুলে যান না। একজন প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়েও তিনি যেভাবে সাধারণ মানুষের মতো এত সময় নিয়ে গোশালায় গিয়ে সেবা করছেন, তা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সত্যিই অনুপ্রেরণামূলক একটি দৃষ্টান্ত।
অন্যদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক দলের অনেকেই এটিকে নিছকই ‘সস্তা রাজনৈতিক চমক’ বা ‘ভোট ব্যাঙ্কের রাজনীতি’ বলে কটাক্ষ করতে পিছপা হননি। তাঁদের মতে, সামনেই যেহেতু একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন রয়েছে, তাই সাধারণ মানুষের সহানুভূতি এবং ধর্মানুরাগী সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের মন জয় করতেই তিনি সচেতনভাবে এই কাজ করেছেন।


Recent Comments