মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি যেন ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। একদিকে ইরানের (Iran) রাজধানী তেহরানে (Tehran) অবস্থিত জ্বালানি তেলের বিশাল ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, অন্যদিকে লেবাননের (Lebanon) রাজধানী বৈরুতে (Beirut) সুনির্দিষ্ট বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল (Israel)। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি, তারা বৈরুতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (IRGC) অভিজাত শাখা ‘কুদস ফোর্স’ (Quds Force)-এর মুখ্য কমান্ডারদের লক্ষ্য করে এই হামলা চালিয়েছে। রবিবার গভীর রাতে এই জোড়া হামলার ঘটনায় গোটা অঞ্চলে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে এবং বড় আকারের যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তেহরানের পরিস্থিতি বর্তমানে বেশ থমথমে। রাতের আঁধারে হঠাৎ করেই শহরের আকাশে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এরপরই বিশাল কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী এবং আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পান স্থানীয় আতঙ্কিত বাসিন্দারা। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার দায় স্বীকার করে বলা হয়েছে, তারা তেহরানের বেশ কয়েকটি ‘জ্বালানি সংরক্ষণ কমপ্লেক্স’ বা তেলের ডিপোতে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। তাদের দাবি, ইরানের শাসকগোষ্ঠী এই জ্বালানি মজুত নিয়মিতভাবে তাদের সামরিক অবকাঠামো চালানো ও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার কাজে ব্যবহার করত। তাই সামরিক কৌশলগত দিক থেকে এই ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করা তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ ছিল। অন্যদিকে, ইরান সরকারিভাবে জানিয়েছে, ফায়ার সার্ভিসের তাৎক্ষণিক ও জোরালো পদক্ষেপে আগুন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।
তেহরানে যখন আগুনের শিখা জ্বলছে, ঠিক প্রায় একই সময়ে লেবাননের প্রাণকেন্দ্র বৈরুতেও রক্তপাতের ঘটনা ঘটে। বৈরুতের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত একটি হোটেলে ভয়াবহ বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, এই অতর্কিত হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন এবং আরও দশজনের বেশি মানুষ আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, যে ভবনটিতে হামলা চালানো হয়েছে, সেটি মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত ও বাস্তুচ্যুত সাধারণ মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। দক্ষিণ লেবানন থেকে পালিয়ে আসা মানুষজন সেখানে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। হামলার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই প্রাণভয়ে ভবন ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হন।
বৈরুতের এই হামলার বিষয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, এটি কোনো সাধারণ হামলা ছিল না। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই ‘সুনির্দিষ্ট হামলা’র মূল লক্ষ্য ছিল কুদস ফোর্সের লেবানন শাখার শীর্ষ কমান্ডাররা। ইসরায়েলের অভিযোগ, এই কমান্ডাররা বৈরুতে বসে ইসরায়েল রাষ্ট্র এবং এর সাধারণ নাগরিকদের ওপর বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছিলেন। ইসরায়েলি বিবৃতিতে নিহত কমান্ডারদের নাম বা পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করা হলেও, তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, প্রতিপক্ষের সামরিক নেতৃত্ব যেখানেই লুকিয়ে থাকুক না কেন, তাদের নির্মূল করার এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এই ধারাবাহিক হামলা ও পাল্টা হামলার জেরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় ও কৌশলগত পরিকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ। ঘরবাড়ি হারিয়ে যারা একটু নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছেন, বৈরুতের মতো শহরের হোটেলেও তাদের ওপর নেমে আসছে মৃত্যুর বিভীষিকা। বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি তেলের ঘাঁটিতে হামলা এবং ইরানি সামরিক কর্তাদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর এই কৌশল পরিস্থিতিকে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্বনেতারা বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও, বাস্তব পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত আরও বেশি ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

