উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্য আসাম (Assam)-এর একটি ঘটনা সমগ্র দেশকে গভীর উদ্বেগে ফেলেছে। রবিবার গভীর রাতে রাজ্যের তিনসুকিয়া (Tinsukia) জেলায় কর্তব্যরত পুলিশ কমান্ডোদের একটি ক্যাম্পের ওপর এক ভয়াবহ এবং অতর্কিত হামলা চালানো হয়েছে। প্রাথমিক তদন্ত ও সূত্র মারফত আমরা জানতে পেরেছি যে, এই বর্বরোচিত হামলার পেছনে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন উলফা স্বাধীন (ULFA-I)-এর হাত থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রশাসন এবং বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটেছে তিনসুকিয়া জেলার অন্তর্গত জাগুন (Jagun) নামক এক দুর্গম এলাকায়। রবিবার রাত আনুমানিক ২টোর সময় যখন চারপাশ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন এবং সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ, ঠিক সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই সশস্ত্র জঙ্গিরা কমান্ডো ক্যাম্পটিতে আক্রমণ চালায়। রাতের এই নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎই বিকট বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের মতে, জঙ্গিরা সুপরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পের দিকে অন্তত পাঁচটি রকেট প্রোপেলড গ্রেনেড (RPG) নিক্ষেপ করে। এই প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ক্যাম্পের পরিকাঠামোর বেশ কিছু অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গ্রেনেড হামলার পরপরই শুরু হয় তীব্র এবং প্রাণঘাতী গুলির লড়াই। আমাদের বীর পুলিশ কমান্ডোরা বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে, নিজেদের জীবন বাজি রেখে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে জঙ্গিদের এই কাপুরুষোচিত আক্রমণের যোগ্য জবাব দেন। প্রায় কুড়ি মিনিট ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল গুলি বিনিময় চলে। রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে জঙ্গিরা শেষমেশ পার্শ্ববর্তী পাহাড় ও জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় বলে প্রাথমিক অনুমান করা হচ্ছে। তবে এই ভয়ানক সংঘর্ষে মাতৃভূমির সুরক্ষায় নিয়োজিত বেশ কয়েকজন অসম পুলিশ কমান্ডো গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।
আহত জওয়ানদের রাতেই দ্রুত উদ্ধার করে নিকটবর্তী চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তাদের চিকিৎসা চলছে। তবে আহতদের শারীরিক অবস্থা এই মুহূর্তে ঠিক কতটা গুরুতর, তা প্রশাসনের তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। জওয়ানদের এই সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগকে দেশবাসী সশ্রদ্ধ কুর্নিশ জানাচ্ছে। অন্যদিকে, আহত কমান্ডোদের পরিবারের সদস্যরা এই মুহূর্তে চরম দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।
এই রোমহর্ষক হামলার পর গোটা জাগুন এবং তার সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় এক থমথমে ও আতঙ্কগ্রস্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। স্থানীয় সাধারণ মানুষদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এর গভীর প্রভাব পড়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মনে সাহস জোগাতে এবং সুরক্ষার খাতিরে পুলিশ প্রশাসন তৎপর রয়েছে। হামলার পরক্ষণেই বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলির জওয়ানরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান। গোটা এলাকাটি বর্তমানে নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া ঘেরাটোপে রয়েছে।
হামলাকারী জঙ্গিদের খোঁজে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে চিরুনি তল্লাশি। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী ঘন জঙ্গল এবং পাহাড়ি এলাকাগুলোতে নজরদারি কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে, কারণ জঙ্গিরা সাধারণত পালানোর জন্য এই ধরনের দুর্গম পথই ব্যবহার করে থাকে। উত্তর-পূর্ব ভারতে শান্তি বজায় রাখার জন্য নিরাপত্তা বাহিনী প্রতিনিয়ত নিরলস পরিশ্রম করে চলেছে, কিন্তু এই ধরনের চোরাগোপ্তা হামলা সেই শান্তি প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। আসাম পুলিশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে এই ষড়যন্ত্রের মূল মাথাদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে।


Recent Comments