সন্ধ্যার আলো নিভে আসে ভেড়িতে — আর জেগে ওঠে ট্রাকের ইঞ্জিন
কলকাতার (Kolkata) পূর্ব প্রান্তে দাঁড়ালে এক অদ্ভুত দ্বৈত জীবনের সাক্ষী হতে হয়। দিনের আলোয় এখানে রোদে চিকচিক করে ভেড়ির জল, মাছের লাফ দেখা যায়, ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি নামে জলের ওপর। কিন্তু রাত গভীর হলে, যখন শহরের কোলাহল থামে, তখন অন্য এক কলকাতা জেগে ওঠে। ট্রাকের পর ট্রাক এসে দাঁড়ায় ভেড়ির পাড়ে। নির্মাণ বর্জ্য, ফ্লাই অ্যাশ (Fly Ash), পৌর আবর্জনা — সব কিছু ঢালা হয় সেই জলে, যে জল এই শহরকে বাঁচিয়ে রেখেছে প্রায় একশো বছর ধরে। ভোরের আলো ফোটার আগেই সেই ভরাট জমির ওপর উঠে যায় দেওয়াল, ছাদ। কয়েক মাসের মধ্যে একটা জীবন্ত জলাশয় পরিণত হয় একটা গুদামঘরে, একটা প্লাইউড ফ্যাক্টরিতে, কিংবা একটা অবৈধ আবাসনে।
এটা কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়। এটা কলকাতার পূর্ব কলকাতা জলাভূমি (East Kolkata Wetlands) — যাকে বিশেষজ্ঞরা বলেন “কলকাতার কিডনি” — সেই জলাভূমির প্রতিদিনের বাস্তব চিত্র। আর এই চিত্রটা যতটা ভয়ঙ্কর, তার চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো এর পেছনের সংগঠিত চক্রান্ত, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, আর রাজনৈতিক মদতের কাহিনি।
২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি নাজিরাবাদ (Nazirabad) গুদামে সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, যেখানে ২৫ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারালেন — সেটা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ছিল না। ওই আগুনের শিখা আসলে আলো ফেলেছিল এক গভীর পচনের ওপর — যেখানে একটি আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত র্যামসার সাইটকে (Ramsar Site) পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে, আর সেই ধ্বংসের মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ — কখনো জীবিকা হারিয়ে, কখনো বিষাক্ত মাছ খেয়ে, আর কখনো আগুনে পুড়ে।
এই বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তুলে ধরছি পূর্ব কলকাতা জলাভূমির ইতিহাস, তার অবিশ্বাস্য বৈজ্ঞানিক মেকানিজম (Mechanism), পরিকল্পিত ধ্বংসের নীলনকশা, আর সেই ধ্বংস ঠেকাতে গেলে এখনই কী কী করা দরকার — সেই সম্পূর্ণ চিত্র।
একটি নদীর মৃত্যু, একটি বাস্তুতন্ত্রের জন্ম
পূর্ব কলকাতা জলাভূমির গল্পটা শুরু হয়েছিল একটা নদীর শেষ নিঃশ্বাসের সঙ্গে। বিদ্যাধরী নদী (Bidyadhari River) — একসময় যে জোয়ারের খাত বঙ্গোপসাগরের (Bay of Bengal) সঙ্গে এই অঞ্চলকে যুক্ত রাখত — ১৯২৮ সালের মধ্যে প্রবল পলি জমে কার্যত মৃত হয়ে গেল। তার সেই বিশাল স্পিল বেসিন (Spill Basin) — তলেগঙ্গে-পাঁচগ্রাম (Tollygunge-Panchagram), কেওড়াপুকুর (Keorapukur), সোনারপুর-আড়পাঁচ (Sonarpur-Arpanch) — সব কিছু পরিণত হলো এক বিপুল, স্থবির জলাভূমিতে।
কিন্তু এই গল্পে দ্বিতীয় চরিত্র হলো কলকাতা শহর নিজেই। ঔপনিবেশিক আমলে শহরের নিকাশি ব্যবস্থা পূর্ব দিকে ঘোরানো হয়েছিল — প্রাকৃতিক ঢালের উল্টো দিকে। ১৮৭৯ সালের দিকে ধাপা (Dhapa) অঞ্চলে শহরের আবর্জনা দিয়ে সবজি চাষের প্রথম চুক্তি হয়। ১৯৪০ সালের মধ্যে শহরের সম্পূর্ণ নর্দমার জল স্থানান্তরিত হয়ে যায় পূর্ব দিকে, কুলতি গং (Kulti Gong) নদীর মাধ্যমে এই জলাভূমির ভেতর দিয়ে।
আর ঠিক এইখানেই ঘটল সেই অসাধারণ ঘটনাটি, যেটা পৃথিবীর পরিবেশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে অনন্য। ত্রিশের দশকে এই জলাভূমির ধারে বসবাসকারী স্থানীয় মৎস্যজীবী আর কৃষকরা — যাঁরা কোনো ইউনিভার্সিটিতে (University) যাননি, কোনো ল্যাবরেটরিতে (Laboratory) গবেষণা করেননি — তাঁরা একটা জিনিস বুঝে গেলেন। শহরের নর্দমার জলে যে জৈব পদার্থ মিশে আসছে, সেটা মাছের জন্য অসাধারণ খাবার হতে পারে। তাঁরা তৈরি করলেন এক অভিনব ব্যবস্থা — সুয়েজ ফেড অ্যাকুয়াকালচার (Sewage-fed Aquaculture)। শহরের বর্জ্য জল পরিশোধিত হতে লাগল প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে, আর সেই পরিশোধনের ফসল হলো মাছ, সবজি, ধান।
প্রয়াত ড. ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ (Dr. Dhrubajyoti Ghosh) — প্রখ্যাত পরিবেশবিদ ও স্যানিটেশন ইঞ্জিনিয়ার (Sanitation Engineer) — যিনি প্রথম এই ব্যবস্থাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেন, তিনি একে বলেছিলেন “প্রকৃতির সঙ্গে সৃজনশীলভাবে বেঁচে থাকার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।” তাঁর চোখে এই জেলে-কৃষকরা ছিলেন এমন প্রকৌশলী যাঁরা কোটি কোটি টাকার সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (Sewage Treatment Plant) ছাড়াই একটা গোটা মহানগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সামলে দিয়েছিলেন — শুধু তাঁদের ট্র্যাডিশনাল ইকোলজিক্যাল নলেজ (Traditional Ecological Knowledge) বা লোকায়ত পরিবেশ জ্ঞানের জোরে।
কিডনি যেভাবে কাজ করে — বিজ্ঞান যেখানে চমকে দেয়
কলকাতা — ভারতের (India) অন্যতম বৃহত্তম মহানগরী, জনসংখ্যা প্রায় ১.৫ কোটি — এই বিশাল শহরের জন্য কিন্তু কোনো সম্পূর্ণ, প্রচলিত সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নেই। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়ছেন। একটি কোটি মানুষের শহরের কোনো সামগ্রিক বর্জ্য জল শোধনাগার নেই। তাহলে এই শহরের নর্দমার জল যায় কোথায়? উত্তরটা হলো — পূর্ব কলকাতা জলাভূমি। আর সেখানে কী হয়, সেটাই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বর্জ্য জল পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার গল্প।
এই জলাভূমি ১২,৫০০ হেক্টর (Hectare) জুড়ে ছড়িয়ে আছে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা (North and South 24 Parganas) জেলায়, ৩৭টি মৌজা (Mouza) জুড়ে। এখানে আছে মিষ্টি জলের মাছের ভেড়ি (Bheri), লোনা জলের ভেড়ি, আবর্জনা খামার (Garbage Farm), আর ধানের জমি।
ব্যবস্থাটা বোঝা যাক সহজ ভাষায়। কলকাতা শহর প্রতিদিন প্রায় ১,৩০০ মিলিয়ন লিটার (Million Liters Per Day – MLD) পৌর বর্জ্য জল তৈরি করে। এই বর্জ্য জলের প্রায় ৯১০ এমএলডি (MLD) খালের জালের মাধ্যমে চলে আসে এই অগভীর ভেড়িগুলোতে। তারপর শুরু হয় প্রকৃতির নিজস্ব খেলা।
ক্রান্তীয় অঞ্চলের প্রখর সূর্যের আলো এই অগভীর জলে পড়ে। সেই আলোর তাপে জলে শৈবালের বিপুল বিস্ফোরণ ঘটে — যাকে বলে অ্যালগাল ব্লুম (Algal Bloom)। এই শৈবাল দ্রুত সালোকসংশ্লেষণ (Photosynthesis) করে, জলে প্রচুর অক্সিজেন (Oxygen) মেশায়, আর কাঁচা বর্জ্য জলের বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (Biochemical Oxygen Demand – BOD) ভেঙে ফেলে। এই পুষ্টিসমৃদ্ধ, অক্সিজেনযুক্ত জলে তারপর বেড়ে ওঠে কার্প (Carp) আর তেলাপিয়া (Tilapia) মাছ। মাছগুলো শৈবাল আর প্ল্যাঙ্কটন (Plankton) খেয়ে জৈব বর্জ্যকে নিজের শরীরে আত্মীকৃত করে ফেলে। ফলে জল পরিশোধিত হয়ে শেষে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে।
এই প্রক্রিয়াটা শুনতে সহজ মনে হতে পারে, কিন্তু এর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব দেখলে চোখ কপালে উঠবে।
অর্থনৈতিক সুবিধা:
• এই প্রাকৃতিক পরিশোধন ব্যবস্থা কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের (Kolkata Municipal Corporation) প্রতি বছর আনুমানিক ৪,৬৮০ থেকে ৪,৭০০ কোটি টাকা বাঁচায় — যে টাকা খরচ হতো যান্ত্রিক সুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালাতে।
• এখান থেকে বছরে ১৩,০০০ টন মাছ উৎপাদিত হয়। এই ভেড়িগুলোতে মাছের ফলন জাতীয় গড়ের দুই থেকে চারগুণ বেশি।
• প্রতিদিন ১৫০ টন তাজা সবজি আর বছরে ১৬,০০০ টন ধান উৎপন্ন হয় এই জলাভূমির জমিতে।
পরিবেশগত সুবিধা:
• এই জলাভূমি একটি বিশাল কার্বন সিঙ্ক (Carbon Sink) — শহরের বর্জ্য জলে থাকা কার্বনের (Carbon) ৬০ শতাংশেরও বেশি শোষণ করে নেয়।
• ৪০ প্রজাতিরও বেশি স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল এটি।
• এখানে বাস করে গুরুতরভাবে বিপন্ন বেঙ্গল মার্শ মঙ্গুস (Bengal Marsh Mongoose) — বৈজ্ঞানিক নাম হারপেস্টিস প্যালাস্ট্রিস (Herpestes palustris)।
• সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — এই ১২,৫০০ হেক্টরের বিশাল জলাভূমি একটি প্রকাণ্ড প্রাকৃতিক স্পঞ্জের (Sponge) মতো কাজ করে। বর্ষার সময় বিপুল বৃষ্টির জল শুষে নিয়ে কলকাতাকে ভয়ঙ্কর বন্যার হাত থেকে রক্ষা করে।
একটু থামুন। এই তথ্যগুলো আরেকবার পড়ুন। একটা শহর, যার ১.৫ কোটি মানুষের বর্জ্য জল পরিশোধনের কোনো যান্ত্রিক ব্যবস্থা নেই, সেই শহরকে বাঁচিয়ে রেখেছে একটা জলাভূমি — যেটা তৈরি করেছিলেন সাধারণ জেলে আর কৃষকরা, তাঁদের লোকায়ত জ্ঞান আর প্রকৃতির সঙ্গে বসবাসের অভিজ্ঞতা দিয়ে। আর আজ সেই জলাভূমিকে আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে মেরে ফেলছি।
সংখ্যার ভাষায় ধ্বংসের হিসাব
জিওস্পেশিয়াল ম্যাপিং (Geospatial Mapping) আর স্যাটেলাইট ইমেজারি (Satellite Imagery) বিশ্লেষণ করলে যে ছবি ফুটে ওঠে, তা শিউরে ওঠার মতো।
গত তিন দশকে পূর্ব কলকাতা জলাভূমির যা হারিয়ে গেছে:
| সময়কাল | ক্ষতির পরিমাণ | প্রধান কারণ |
|---|---|---|
| ১৯৯১ – ২০২১ | মোট এলাকার ৩৬% হ্রাস | রিয়েল এস্টেট (Real Estate) রূপান্তর, অবৈধ ভরাট |
| ১৯৮৯ – ২০২৪ | জলাভূমি এলাকার ৩৪% হ্রাস | নগর অবকাঠামো, কংক্রিট (Concrete) হাইওয়ে (Highway) |
| ২০০২ – ২০১৬ | ভাগবানপুর মৌজায় (Bhagabanpur Mouza) জলের আচ্ছাদন ৮৮% থেকে মাত্র ১৯%-এ পতন | পলি জমা, অতিক্রমণ |
| ১৯৯০ – ২০১১ | ১,৪৭৬ হেক্টর মাছের খামার হারিয়ে গেছে | কৃষিজমি রূপান্তর, বসতি সম্প্রসারণ |
একটু আরও কাছ থেকে দেখলে? ২০১৪ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, ৬২টি বড় মাছের পুকুর সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেছে। কার্যকর ভেড়ির সংখ্যা ২৬৪ থেকে নেমে এসেছে মাত্র ২০২-তে।
এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি ভেড়ি হারিয়ে যাওয়ার পেছনে আছে একটা পরিবারের জীবিকার মৃত্যু, একটা সম্প্রদায়ের উচ্ছেদ, আর কলকাতার নিজের ভবিষ্যতের একটুকরো অংশের বিনাশ।
ধ্বংসের নীলনকশা — যেভাবে একটি ভেড়ি মরে যায়
পূর্ব কলকাতা জলাভূমির এই ধ্বংস কোনো দৈব দুর্ঘটনা নয়। এটি একটি অত্যন্ত সংগঠিত, পরিকল্পিত প্রক্রিয়া — যেখানে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার (Real Estate Developer), স্থানীয় ভূমি মাফিয়া (Land Mafia), আর দুর্নীতিগ্রস্ত পৌর কর্মকর্তারা একসঙ্গে কাজ করেন। এই চক্রান্তের একটা নির্দিষ্ট ব্লুপ্রিন্ট (Blueprint) আছে। সেটা বোঝা দরকার।
প্রথম ধাপ — হাইড্রোলজিক্যাল স্যাবোটাজ (Hydrological Sabotage) বা জলতাত্ত্বিক নাশকতা:
একটা চলমান, উৎপাদনশীল ভেড়িকে মারতে হলে প্রথমে তার জীবনরেখা কেটে দিতে হয়। সেই জীবনরেখা হলো শহরের বর্জ্য জল বহনকারী প্রাথমিক ও মাধ্যমিক ফিডার খাল (Feeder Canal)। অপরাধীরা ইচ্ছাকৃতভাবে এই খালগুলোতে পলি জমায়, পাইপ বন্ধ করে, বা খালের মুখ বুজিয়ে দেয়। ফলে ভেড়িতে আর পর্যাপ্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ বর্জ্য জল আসে না। পুকুর শুকিয়ে যায়, মাছের ফলন কমে, আর ব্যবসা অলাভজনক হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় ধাপ — অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ:
যখন জেলে সমবায়গুলো (Fishworker Cooperatives) আর্থিকভাবে ভেঙে পড়তে শুরু করে, তখন তাঁদের কাছে আসে মহাজনের ঋণ — চড়া সুদে, অসম শর্তে। ঋণ শোধ করতে না পেরে জেলেরা বাধ্য হন তাঁদের পুরুষানুক্রমিক জমি আর দীর্ঘমেয়াদি ইজারা বিক্রি করতে — রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের দালালদের কাছে।
তৃতীয় ধাপ — রাতের আড়ালে ভরাট:
একবার জেলেরা সরে গেলে, শুরু হয় আসল কাজ। গভীর রাতে, পরিবেশ নজরদারি বা পুলিশের (Police) চোখ এড়িয়ে, বিশাল সংখ্যক ট্রাক এসে পৌর কঠিন বর্জ্য, নির্মাণ ধ্বংসাবশেষ, ফ্লাই অ্যাশ আর মাটি ঢেলে দেয় স্থবির জলাশয়ে। নতুন তৈরি হওয়া কঠিন জমি দ্রুত দেওয়াল দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়, প্লট (Plot) ভাগ করা হয়।
চতুর্থ ধাপ — বৈধতার মুখোশ:
এই অবৈধভাবে পুনরুদ্ধার করা জমিতে তারপর আসে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংযোগ, কংক্রিটের অ্যাপ্রোচ রোড (Approach Road) — প্রায়ই স্থানীয় পঞ্চায়েত (Panchayat) কর্তাদের সরাসরি মদতে, র্যামসার নির্দেশিকার সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে। এইভাবে একটি অবৈধ বসতি বা বাণিজ্যিক কাঠামো কাগজে-কলমে “বৈধ” হয়ে যায়।
নাজিরাবাদের সেই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড ছিল এই পুরো প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফলাফল। করিমপুর মৌজায় (Karimpur Mouza) অবৈধভাবে ভরাট করা জলাভূমির ওপর তৈরি হয়েছিল বিশাল বাণিজ্যিক গুদাম। সেখানে আইনি অনুমোদন ছাড়া, জলাভূমি ছাড়পত্র ছাড়া, বুনিয়াদি অগ্নি নিরাপত্তা মান না মেনে মজুত করা হয়েছিল অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ। সেদিন ২৫ জনের বেশি মানুষ পুড়ে মারা গেলেন। তাঁদের মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা ছিল না — তাঁরা একটি পরিকল্পিত পরিবেশ অপরাধের শিকার।
বিষের বৃত্ত — যখন মাছও হয়ে ওঠে ঘাতক
পূর্ব কলকাতা জলাভূমির ভৌগোলিক সীমানা যেমন সংকুচিত হচ্ছে, তেমনই টিকে থাকা জলাশয়গুলোর অভ্যন্তরীণ রসায়নও ভয়ঙ্করভাবে বদলে যাচ্ছে। আর এই পরিবর্তনটা সরাসরি আঘাত করছে কলকাতা শহরের প্রতিটি মানুষের রান্নাঘরে — তাঁদের থালায়।
সমস্যাটা কোথায়, সেটা বোঝা যাক। এই জলাভূমি মূলত তৈরি হয়েছিল গৃহস্থালি বর্জ্য জল — অর্থাৎ জৈব পদার্থসমৃদ্ধ সুয়েজ (Sewage) — পরিশোধনের জন্য। কিন্তু গত কয়েক দশকে কলকাতার পূর্ব প্রান্তে অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন (Industrialization) ঘটেছে। ফ্যাক্টরি (Factory), ট্যানারি (Tannery), ইলেক্ট্রোপ্লেটিং (Electroplating) ইউনিট — এদের বিষাক্ত শিল্প বর্জ্য (Industrial Effluent) সরাসরি এই জলাভূমির ফিডার খালে এসে পড়ছে, কোনো শোধন ছাড়াই।
এই বিপুল পরিমাণ অশোধিত বর্জ্য জলাভূমির প্রাকৃতিক পরিশোধন ক্ষমতা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন (Nitrogen) আর ফসফরাসের (Phosphorus) কারণে ঘটছে হাইপার-ইউট্রোফিকেশন (Hyper-eutrophication) — অর্থাৎ অনিয়ন্ত্রিত শৈবাল বিস্ফোরণ যা সূর্যের আলো আটকে দেয়, দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দেয়, তৈরি করে ডেড জোন (Dead Zone) — মৃত অঞ্চল — যেখানে মাছ গণহারে মারা যায়।
কিন্তু এর চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো হেভি মেটাল (Heavy Metal) বা ভারী ধাতুর সঞ্চয়।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Jadavpur University) এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ (Indian Council of Agricultural Research – ICAR) -এর মতো প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক ভূ-রাসায়নিক ও জৈবিক নমুনা পরীক্ষায় যা উঠে এসেছে, তা রীতিমতো আতঙ্কজনক।
জলাভূমির পলিতে (Sediment) পাওয়া গেছে:
• ম্যাঙ্গানিজ (Manganese – Mn): ২০৫.০±৬৫.৫ মিলিগ্রাম/কেজি (mg/kg)
• কপার (Copper – Cu): ২৯.৯±১০.২ মিলিগ্রাম/কেজি
• লেড (Lead – Pb): ২২.৭±১০.৩ মিলিগ্রাম/কেজি
এই ভারী ধাতু কিন্তু পলিতে চুপচাপ বসে থাকে না। এরা ফাইটোএক্সট্রাকশন (Phytoextraction) আর বায়োঅ্যাকুমুলেশন (Bioaccumulation) প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ ও প্রাণীদের শরীরে জমা হতে থাকে — খাদ্য শৃঙ্খলের (Food Chain) প্রতিটি স্তরে।
সবজিতে বিষ:
জলাভূমির পাশে জন্মানো খাদ্যযোগ্য সবজি — লাউ বা ল্যাজেনারিয়া সিসেরারিয়া (Lagenaria siceraria), ঢেঁড়স বা আবেলমস্কাস এসকুলেন্টাস (Abelmoschus esculentus), ভুট্টা বা জিয়া মেজ (Zea mays) — এদের খাদ্যযোগ্য অংশে ধাতুর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization – WHO) আর খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (Food and Agriculture Organization – FAO) নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বেশি। ভুট্টায় লেড (Lead)-এর মাত্রা পাওয়া গেছে ৩১.৭৮ থেকে ৪২.৩৩ পিপিএম (ppm) — যা অত্যন্ত বিষাক্ত মাত্রা।
মাছে বিষ:
রুই বা ল্যাবিও রোহিতা (Labeo rohita), কাতলা বা কাটলা কাটলা (Catla catla), তেলাপিয়া বা ওরিওক্রোমিস নিলোটিকাস (Oreochromis niloticus) — স্থানীয় খাদ্যের মূল এই মাছগুলোর পেশি, ফুলকা ও যকৃতে জমা হচ্ছে লেড, ক্যাডমিয়াম (Cadmium), ক্রোমিয়াম (Chromium) আর মার্কারি (Mercury)।
এই বিষের স্বাস্থ্যগত প্রভাব কী?
ভারী ধাতু স্বাস্থ্য ঝুঁকি
লেড (Lead) শিশুদের তীব্র মানসিক প্রতিবন্ধকতা, শিশুমৃত্যু ঘটানো এনসেফ্যালোপ্যাথি (Encephalopathy), জন্মগত পক্ষাঘাত, শ্রবণশক্তি হ্রাস, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের (Central Nervous System) ক্ষতি
ক্যাডমিয়াম (Cadmium) অপরিবর্তনীয় কিডনি (Kidney) ক্ষতি, হাড়ের খনিজ ক্ষয়, শ্বাসকষ্ট, সম্ভাব্য ক্যান্সারকারক (Carcinogen)
ক্রোমিয়াম (Chromium) মারাত্মক লিভার (Liver) ক্ষতি, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, পরিপাকতন্ত্রে আলসার (Ulcer) ও রক্তক্ষরণ
মার্কারি (Mercury) তীব্র স্নায়বিক বিষাক্ততা, বিকাশগত বিলম্ব, মোটর ডিসফাংশন (Motor Dysfunction)
আর এই দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি বাড়ে বর্ষাকালে। বর্ষার জলস্রোত কলকাতার শিল্পাঞ্চল থেকে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ শিল্প বর্জ্য ফ্লাশ (Flush) করে সরাসরি ঢেলে দেয় জলাভূমির সূক্ষ্ম জলতন্ত্রে।
এর মানে কী দাঁড়াচ্ছে? কলকাতার লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন বাজার থেকে রুই-কাতলা কিনে আনছেন, যখন সবজি কিনে রান্না করছেন — তাঁরা হয়তো জানেনই না যে তাঁদের থালায় প্রতিদিন একটু একটু করে বিষ ঢুকছে। এটা কোনো তাৎক্ষণিক বিষক্রিয়া নয় — এটা দীর্ঘমেয়াদি, ক্রমযোজিত, নীরব বিষক্রিয়া — যা বছরের পর বছর ধরে শরীরে জমা হতে থাকে আর একদিন প্রকাশ পায় ক্যান্সার (Cancer), কিডনি বিকলতা, বা সন্তানের স্নায়বিক বিকাশের ত্রুটি হিসেবে।
মানুষের কথা — যাঁরা এই ধ্বংসের মূল্য দিচ্ছেন
সংখ্যা আর বিজ্ঞান দিয়ে পূর্ব কলকাতা জলাভূমির ধ্বংস বোঝানো যায়, কিন্তু আসল ব্যথাটা বুঝতে গেলে মানুষের মুখের দিকে তাকাতে হয়। এই ৩৭টি মৌজায় বাস করেন আনুমানিক দেড় লক্ষ মানুষ — যাঁদের জীবন, জীবিকা, পরিচয় — সবকিছু এই জলাভূমির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
জীবিকার মৃত্যু
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অঞ্চলের মৎস্যজীবী আর কৃষকরা একটি সমবায় কাঠামোর মধ্যে কাজ করে এসেছেন। তাঁদের জীবিকা নির্ভর করত লোকায়ত জ্ঞান, সম্মিলিত শ্রম, আর প্রকৃতির নির্ভরযোগ্য দানের ওপর। আজ এই সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব হুমকির মুখে।
ইচ্ছাকৃতভাবে খাল বন্ধ করে দেওয়ায় পুকুরে আর আগের মতো পুষ্টিসমৃদ্ধ বর্জ্য জল আসে না। ফলে ঐতিহ্যবাহী মাছ চাষ আর লাভজনক থাকছে না। জনপ্রিয়, উচ্চমূল্যের মাছের প্রজাতি, যেমন জিওল (Jiyol), একেবারে উধাও হয়ে গেছে জালে ধরা মাছের তালিকা থেকে।
হাতগাছা মৌজায় (Hatgachha Mouza) — ধাপা মানপুরের (Dhapa Manpur) কাছে, একসময়ের বৃহত্তম মৌজা — ২০২২ সালে ১,৬২২টি পরিবারের ওপর করা একটি আর্থ-সামাজিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৫০ শতাংশ স্থানীয় জনসংখ্যা সুয়েজ-ভিত্তিক জীবিকা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাঁরা এখন ঠেলে দেওয়া হচ্ছে অসংগঠিত শহুরে শ্রমিক খাতে — দিনমজুর, রিকশা চালক, নির্মাণ শ্রমিক — যেখানে কোনো নিশ্চয়তা নেই, কোনো মর্যাদা নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
ঋণের ফাঁদ ও মাফিয়ার সন্ত্রাস
এই পরিবর্তন কিন্তু স্বাভাবিক বা শান্তিপূর্ণ নয়। এর পেছনে আছে জবরদস্তি আর পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ফাঁদ।
যখন সরকারি সহায়তা নেই, স্বচ্ছ শাসন নেই, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষুদ্রঋণের সুযোগ নেই — তখন জেলেরা বাধ্য হচ্ছেন স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে, শুধু খারাপ হয়ে যাওয়া পুকুর চালু রাখার জন্য। যখন বিষাক্ত জল বা সরবরাহ বিঘ্নের কারণে মাছের ফলন কমে যায়, তখন ঋণ শোধ হয় না। আর সেই ঋণ শোধ করতে গিয়ে তাঁরা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন তাঁদের পূর্বপুরুষের জমি, দীর্ঘমেয়াদি ইজারা — রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের দালালদের কাছে।
আর যেখানে অর্থনৈতিক চাপ কাজ করে না, সেখানে আসে শারীরিক সন্ত্রাস। দক্ষিণ গোরুমারা (Dakshin Gorumara) মাছের খামারের ঘটনাটা এই প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এই দুটি যমজ মাছের খামারের লোভনীয় জমি দখল করতে ভূমি মাফিয়া সমবায়ের কর্মীদের কাছে একটি নির্মম প্রস্তাব রাখল: প্রতি সদস্যকে ১ লক্ষ টাকা নগদ আর একটি তুচ্ছ চাকরির বিনিময়ে ভেড়ি ছেড়ে দিন — নয়তো ভাড়াটে গুন্ডাদের হাতে চরম শারীরিক নির্যাতন সহ্য করুন।
এই ভয় আর হতাশা সম্প্রদায়কে ভেঙে দিল। দক্ষিণ গোরুমারা নম্বর ২ (Dakshin Gorumara No. 2)-এর সদস্যরা অটল থাকলেন। কিন্তু দক্ষিণ গোরুমারা নম্বর ১ (Dakshin Gorumara No. 1)-এর সমবায় ভেঙে গেল — অর্ধেক কর্মী নিছক আতঙ্ক আর হতাশায় অবৈধ ক্রয়মূল্য মেনে নিলেন।
এভাবেই — অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ আর শারীরিক সন্ত্রাসের যুগলবন্দিতে — একটি আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত জলাভূমি ব্যক্তিগত, বাণিজ্যিক হাতে চলে যাচ্ছে।
কলকাতা শহরের ওপর প্রভাব — শুধু জেলেদের সমস্যা নয়
অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, এটা তো শহরের বাইরের জেলে আর কৃষকদের সমস্যা — শহরের মানুষের এতে কী? এই ভাবনাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
প্রথমত, খাদ্য নিরাপত্তা: পূর্ব কলকাতা জলাভূমি কলকাতার প্রাথমিক ফুড বাস্কেট (Food Basket) বা খাদ্যভাণ্ডার। এখান থেকে আসা মাছ, সবজি কলকাতার বাজারে বিক্রি হয়। সেই মাছে, সবজিতে যে পরিমাণ ভারী ধাতু জমা হচ্ছে — তা কলকাতার সমগ্র মেট্রোপলিটন (Metropolitan) জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘমেয়াদি, নিম্নমাত্রার বিষাক্ততার মুখে ফেলছে। ফলে বাড়ছে স্নায়বিক রোগ, শিশুদের বিকাশগত বিলম্ব, কিডনি বিকলতা, আর বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি।
দ্বিতীয়ত, বন্যা: যখন জলাভূমি কংক্রিটে ভরাট হয়, তখন কলকাতা হারায় তার প্রাথমিক বন্যা-প্রতিরোধী অবকাঠামো। পরিধির বাফার জোনের (Buffer Zone) ৬০ শতাংশেরও বেশি কংক্রিটে ঢাকা পড়ে গেছে। ফলে বর্ষায় বৃষ্টির জল শোষণের ক্ষমতা কমেছে, প্রাকৃতিক নিকাশির দক্ষতা ধ্বংস হয়েছে। পূর্ব কলকাতা জলাভূমির এই বিশাল স্পঞ্জ ছাড়া কলকাতা ভবিষ্যতে প্রতিটি বর্ষায় ভয়ঙ্কর, দীর্ঘস্থায়ী জলমগ্নতার মুখোমুখি হবে — এটা আর কোনো অনুমান নয়, এটা গাণিতিক নিশ্চয়তা।
তৃতীয়ত, জলবায়ু: জলাভূমির বিশাল কার্বন সিঙ্ক ধ্বংস হওয়া মানে স্থানীয় বাতাসের গুণমান এবং মাইক্রোক্লাইমেট (Microclimate) বা অণুজলবায়ু নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়া। আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট (Urban Heat Island Effect) বাড়বে, শ্বাসকষ্টের সংকট তীব্র হবে আগামী দশকগুলোতে।
সুতরাং, পূর্ব কলকাতা জলাভূমির ধ্বংস শুধু কিছু জেলের জীবিকার প্রশ্ন নয় — এটা সমগ্র কলকাতা মহানগরীর বেঁচে থাকার প্রশ্ন।
আইনের ঢাল, কিন্তু সেই ঢালে ফুটো
পূর্ব কলকাতা জলাভূমি সুরক্ষিত — কাগজে-কলমে। ২০০২ সালের আগস্টে এটি র্যামসার সাইটের (Ramsar Site) মর্যাদা পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) সরকার ২০০৬ সালে প্রণয়ন করেছে ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডস (কনজার্ভেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট) অ্যাক্ট (East Kolkata Wetlands Conservation and Management Act, 2006)। গঠিত হয়েছে ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডস ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (East Kolkata Wetlands Management Authority – EKWMA)। কিন্তু এই আইনি কাঠামোটা খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এটি আসলে একটি ফাঁপা দুর্গ।
আইনের মারাত্মক ত্রুটি:
সেকশন ১০(৫) (Section 10(5)) — ধ্বংসের পেছনের দরজা:
এই ধারাটি ভূমি ব্যবহার পরিবর্তনের অনুমতি দেয় যদি প্রস্তাবিত প্রকল্প “স্থানীয় পরিবেশ” বা “পরিপার্শ্বের উন্নতি” (Enhancement) ঘটায়। কিন্তু “উন্নতি” কাকে বলে, তার কোনো আইনি বা বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি! ফলে এই অস্পষ্টতাকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিক উন্নয়ন, ইকো-ট্যুরিজম হাব (Eco-tourism Hub), রিয়েল এস্টেট — সবকিছু “জনস্বার্থ” বা “পরিবেশ উন্নয়ন”-এর নামে অনুমোদিত হচ্ছে।
সেকশন ৩(২) (Section 3(2)) — ক্ষমতার একচেটিয়া:
২০১৭ সালের সংশোধনীতে ইকেডব্লিউএমএ (EKWMA) পুনর্গঠিত হয়। ১৩টি প্রাথমিক পদের মধ্যে (পরে কার্যত ১৭-এ প্রসারিত) ১৪টি সংরক্ষিত সরকারি সংস্থা, সচিব আর রাজ্যমন্ত্রীদের জন্য। মৎস্যজীবী সমবায়ের জন্য মাত্র একটি মনোনীত আসন। স্বতন্ত্র পরিবেশবিদ, এনজিও (NGO), বর্জ্য সংগ্রাহক (Waste Recycler) — কারও কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।
সেকশন ৭ (Section 7) — জবাবদিহির পলায়ন পথ:
এই ধারা অনুযায়ী, বোর্ডে (Board) শূন্যপদ থাকলে বা প্রান্তিক প্রতিনিধি অনুপস্থিত থাকলেও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত আইনত বৈধ থাকবে। অর্থাৎ, সরকার চাইলে মাছ ধরা মানুষদের গলার স্বর বন্ধ রেখেই সব সিদ্ধান্ত নিতে পারে — সম্পূর্ণ আইনসম্মতভাবে!
বাজেট বঞ্চনা:
পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ দপ্তর (Environment Department) রাজ্য বাজেটের মাত্র ০.০০০৩% (২০২৪-২৫ সালে) পায়। এত অর্থ দিয়ে একটা আন্তর্জাতিক গুরুত্বের জলাভূমির নজরদারি, অতিক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, ভাঙন আদেশ কার্যকর করা — সবটা কীভাবে সম্ভব?
মানচিত্র কারসাজি — সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অভিযোগ
র্যামসার মর্যাদা পাওয়ার দুই দশক পরেও ইকেডব্লিউএমএ সম্প্রতি সরকারি মালিকানাধীন জমির মাত্র ৫-৬ শতাংশে জিও-ট্যাগড (Geo-tagged) সীমানা পিলার (Boundary Pillar) বসানো শুরু করেছে। এই তিন দশকের অস্পষ্টতা কোনো প্রশাসনিক দুর্বলতা ছিল না — এটা ছিল ভূমি দখলদারদের জন্য প্রয়োজনীয় ধূসর অঞ্চল।
কিন্তু এর চেয়েও ভয়ঙ্কর যে অভিযোগটি উঠেছে — ২০২৬ সালের নাজিরাবাদ অগ্নিকাণ্ডের পর পরিবেশ পর্যবেক্ষকরা আবিষ্কার করেন যে অফিসিয়াল ইকেডব্লিউ মানচিত্রে (Map) ইচ্ছাকৃত কারসাজি করা হয়েছে। বিশাল মানব বসতি, সম্পূর্ণ আবাসিক কলোনি (Colony) — যেমন গুলশান কলোনি (Gulshan Colony) — এবং নাজিরাবাদের মতো বিশাল বাণিজ্যিক গুদাম অঞ্চলকে সর্বশেষ অফিসিয়াল র্যামসার মানচিত্র থেকে রহস্যজনকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, নাম পরিবর্তন করা হয়েছে, বা একেবারে মুছে ফেলা হয়েছে। কাগজে-কলমে এই জোনগুলোর শ্রেণিবিভাগ বদলে দিয়ে কর্তৃপক্ষ কার্যত বিশাল অননুমোদিত অবকাঠামো নির্মাণকে বৈধতা দিয়েছে — পরিবেশ অপরাধকে অফিসিয়াল রেকর্ড (Record) থেকে মুছে দিয়েছে।
বিচার বিভাগ — শেষ ভরসা
যেখানে প্রশাসন ব্যর্থ, সেখানে বিচার বিভাগই হয়ে উঠেছে জলাভূমি রক্ষার শেষ দুর্গ।
১৯৯২ সালে কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) ঐতিহাসিক রায় — পাবলিক (PUBLIC) বনাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মামলায় — বিচারপতি উমেশচন্দ্র ব্যানার্জি (Justice Umesh Chandra Banerjee) নগর উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তা আইনিভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। প্রস্তাবিত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের (World Trade Centre) জন্য জলাভূমি পুনরুদ্ধারের রাজ্য সরকারের প্রচেষ্টা আদালত বন্ধ করে দেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (National Green Tribunal – NGT) পূর্ব বেঞ্চ (Eastern Bench) বারবার হস্তক্ষেপ করেছে। পরিবেশকর্মীরা জরুরি আবেদন জানিয়েছেন করিমপুর মৌজায় ৮৮ একরেরও বেশি অবৈধ ভরাট, অননুমোদিত বিদ্যুৎ সংযোগ, মোল্লার ভেড়িতে (Mollar Bhery) পৌর কঠিন বর্জ্য ফেলা ইত্যাদি বিষয়ে। সুভাষ দত্ত (Subhas Datta) বনাম রাজ্য [ওএ ৩২/২০১৯ (OA 32/2019)] মামলায় এনজিটি (NGT) শহুরে স্থানীয় সংস্থার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি কারাদণ্ড ও বেতন আটক রাখার কঠোর সতর্কতা জারি করেছে।
কিন্তু বাস্তবে? এনজিটি ভাঙন আদেশ দিয়েছে, প্রাকৃতিক জলতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছে — স্থানীয় পঞ্চায়েত আর ইকেডব্লিউএমএ সেগুলো কার্যকর করতে দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতা দেখিয়ে চলেছে। ইকেডব্লিউএমএ ওয়েবসাইটে (Website) ২০০৭ সাল থেকে লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ৩৫৮টি মামলা তালিকাভুক্ত আছে — কিন্তু তার মধ্যে খুবই সামান্য কয়েকটিতে প্রকৃত ভাঙন হয়েছে।
নাজিরাবাদের সেই আগুন — যেখানে ২৫ জন মানুষ একটি অবৈধভাবে নির্মিত, অত্যন্ত দাহ্য বাণিজ্যিক কাঠামোয় পুড়ে মারা গেলেন, যেটা সরাসরি একটি ভরাট ভেড়ির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল — সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এই নিয়ন্ত্রক পক্ষাঘাত আর রাষ্ট্রের পরিবেশ আইন প্রয়োগে অনড় অনীহার মারাত্মক পরিণতি কী হতে পারে।
যাঁরা লড়ছেন — নাগরিক সমাজ ও তৃণমূল প্রতিরোধ
সরকারি উদাসীনতা আর কর্পোরেট (Corporate) আগ্রাসনের মুখে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি রক্ষার লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছেন কিছু সাহসী মানুষ — নাগরিক সংগঠন, পরিবেশবাদী এনজিও, আর মাটির কাছের সমবায়গুলো।
পাবলিক (People United for Better Living in Calcutta – PUBLIC) সংগঠন, যার নেতৃত্বে আছেন বনানী কাকাড় (Bonani Kakkar), ১৯৯২ সালের সেই ভিত্তিমূলক জনস্বার্থ মামলা (Public Interest Litigation – PIL) দায়ের করেছিলেন যা আজও পূর্ব কলকাতা জলাভূমির আইনি সুরক্ষার প্রাথমিক অস্ত্র।
সবুজ মঞ্চ (Sabuj Mancha) — নবা দত্তের (Naba Datta) নেতৃত্বে, সেভ রবীন্দ্র সরোবর ফোরাম (Save Rabindra Sarobar Forum) — সোমেন্দ্র মোহন ঘোষের (Somendra Mohan Ghosh) নেতৃত্বে, এবং প্রয়াশ (Proyash), বসুন্ধরা (Basundhara) — এই সংগঠনগুলো ক্রমাগত ইকেডব্লিউএমএ-র ওপর চাপ বজায় রেখেছে। মানচিত্র কারসাজির কেলেঙ্কারি এরাই প্রকাশ্যে এনেছে। নাজিরাবাদ অগ্নিকাণ্ডের পর তাৎক্ষণিকভাবে এনজিটি-তে আবেদন করেছে — স্বতন্ত্র তদন্ত, আনন্দপুর খাল (Anandapur Canal) সংকীর্ণকরণ বন্ধ, আর পলিউটার পেজ (Polluter Pays) নীতি প্রয়োগের দাবিতে।
মাঠের লড়াই লড়ছেন জেলেরা নিজেই। দিশা (DISHA — Society for Direct Initiative for Social and Health Action) সংগঠন পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন সমবায়ে সংগঠিত করে চলেছে।
ন্যাশনাল ফেডারেশন অফ স্মল-স্কেল ফিশওয়ার্কার্স (National Federation of Small-Scale Fishworkers – NFSF) নৌকা প্রচারাভিযান চালিয়ে মৃতপ্রায় জলাভূমির দুর্দশা জনসমক্ষে তুলে ধরছে। তাঁদের মূল দাবি — মৎস্যজীবী সম্প্রদায়কে জলাশয়ের প্রাথমিক, স্বাভাবিক তত্ত্বাবধায়ক (Custodian) হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে।
যাঁরা ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ জ্ঞান দিয়ে এই জলাভূমি টিকিয়ে রেখেছেন শতাব্দীর পর শতাব্দী, তাঁদেরই হাতে থাকতে হবে এটি রক্ষা করার আইনি ক্ষমতা।
ভয়ঙ্কর ভয়ভীতি, ভাড়াটে গুন্ডাদের শারীরিক হামলা, বর্জ্য জলের সরবরাহ লাইন ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করার পরেও — বেশ কিছু সমবায় অটল আছে। তাঁরা তাঁদের পূর্বপুরুষের জীবিকা ছাড়তে রাজি নন। এই মানুষগুলোই পূর্ব কলকাতা জলাভূমির শেষ প্রতিরক্ষা রেখা।
এখনও সময় আছে — কী করতে হবে?
পূর্ব কলকাতা জলাভূমির বর্তমান গতিপথ সরাসরি নির্দেশ করছে আগামী দশকের মধ্যে বিপর্যয়কর পরিবেশগত পতনের দিকে। কিন্তু এই পরিণতি একেবারে অনিবার্য নয় — যদি এখনই আমূল পরিবর্তন আনা যায়। প্রয়োজন নগর পরিকল্পনায় আমূল বদল, কঠোর আইনি প্রয়োগ, আর আক্রমণাত্মক পরিবেশ পুনরুদ্ধার।
১. শাসনব্যবস্থার গণতন্ত্রীকরণ
প্রান্তিক মানুষের অন্তর্ভুক্তি: ইকেডব্লিউ অ্যাক্ট (EKW Act) জরুরি ভিত্তিতে সংশোধন করতে হবে। মৎস্যজীবী সমবায়ের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধি, বর্জ্য সংগ্রাহক ইউনিয়ন (Union), এবং স্বতন্ত্র পরিবেশবাদী এনজিও-দের জন্য নিশ্চিত, বাধ্যতামূলক বোর্ড আসন রাখতে হবে।
স্বতন্ত্র মনোনয়ন: রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া রোধ করতে অ-সরকারি সদস্যদের মনোনয়ন এনজিটি বা স্বীকৃত সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়ামের (Consortium) মাধ্যমে হওয়া উচিত।
আইনি ফাঁক বন্ধ: সেকশন ১০(৫)-এ “পরিবেশ উন্নয়ন”-এর কঠোর, বৈজ্ঞানিকভাবে সংজ্ঞায়িত মানদণ্ড লাগাতে হবে — যাতে কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা এই ছদ্মবেশে অনুমোদন না পায়।
২. আক্রমণাত্মক পরিবেশ পুনরুদ্ধার ও ফাইটোরিমিডিয়েশন (Phytoremediation)
পিজিপিআর-সহায়তাযুক্ত সহ-চাষ (PGPR-Assisted Co-cultivation): ভারী ধাতুর বিষাক্ততা কমাতে রাজ্যকে জলাভূমির সব কৃষিতে প্ল্যান্ট গ্রোথ-প্রমোটিং রাইজোব্যাকটেরিয়া (Plant Growth-Promoting Rhizobacteria – PGPR) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। এই অণুজীবিক (Microbial) হস্তক্ষেপ বায়োফার্টিলাইজার (Biofertilizer) হিসেবে কাজ করে, এবং সেইসঙ্গে বিষাক্ত ভারী ধাতুকে কম জৈবসহজলভ্য (Bioavailable) রূপে পরিণত করে — ফলে সবজিতে ধাতু শোষণ কমে।
কৌশলগত ফাইটোরিমিডিয়েশন: ভেড়ির পাশে, ফিডার খালের তীরে, ভারী দূষিত মাটিতে নির্দিষ্ট হাইপারঅ্যাকুমুলেটিং (Hyperaccumulating) উদ্ভিদ লাগাতে হবে। ব্রাসিকা জাংসিয়া (Brassica juncea) বা ইন্ডিয়ান মাস্টার্ড (Indian Mustard) এবং টেরিস ভিট্টাটা (Pteris vittata) বা চাইনিজ ব্রেক ফার্ন (Chinese Brake Fern) — এই প্রজাতিগুলো মাটি থেকে ক্যাডমিয়াম, লেড, আর্সেনিক (Arsenic) দ্রুত শোষণ করতে অত্যন্ত কার্যকর। পাশাপাশি গভীর-মূল, কম-ধাতু-শোষণকারী বহুবর্ষজীবী ঘাস যেমন স্যাকারাম স্পন্টেনিয়াম (Saccharum spontaneum) বা কাশ ঘাস (Kans Grass) মাটি স্থিতিশীল করবে, বর্ষায় বিষাক্ত প্রবাহ ঠেকাবে, আর বায়োএনার্জি (Bioenergy) ফসল হিসেবে স্থানীয় আয়ের বিকল্প উৎস হতে পারবে।
গার্বেজ এনজাইম (Garbage Enzyme) প্রয়োগ: অ্যাকুয়াকালচার ট্যাংকে (Tank) ১০-১৫% ঘনত্বে বায়ো-ক্যাটালিটিক (Bio-catalytic) গার্বেজ এনজাইম প্রয়োগ বাড়াতে হবে। এই পরিবেশ-বান্ধব হস্তক্ষেপ দ্রুত শিল্প বর্জ্য স্থিতিশীল করে, অ্যামোনিয়া (Ammonia) প্রশমিত করে, দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা পুনরুদ্ধার করে — ব্যয়বহুল রাসায়নিক শোধন ছাড়াই।
৩. ট্র্যাডিশনাল ইকোলজিক্যাল নলেজ (TEK)-এর সমন্বয়
বৃক্ষায়ুর্বেদ ও প্রাকৃতিক কৃষি: ভেড়ির পাশের কৃষি জমিতে সিন্থেটিক রাসায়নিক সার (Fertilizer) ও কীটনাশক (Pesticide) সম্পূর্ণ বন্ধ করে বৃক্ষায়ুর্বেদ (Vrikshayurveda) পদ্ধতিতে জৈব সার, গোবর, উদ্ভিদ-ভিত্তিক কীটনাশক ব্যবহারে যেতে হবে।
স্থানীয় তত্ত্বাবধায়ক ক্ষমতায়ন: জেলেদের ঋতু-ভিত্তিক জলপ্রবাহ, খাল রক্ষণাবেক্ষণ, প্রাকৃতিক শৈবাল চাষ সম্পর্কে যে গভীর জ্ঞান আছে — সেটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। এই মানুষদের “কমিউনিটি ওয়ার্ডেন” (Community Warden) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে, মোবাইল অ্যাপ (Mobile App) রিপোর্টিং সিস্টেম (Reporting System) আর আইনি নজরদারি ক্ষমতা দিয়ে — রিয়েল-টাইম (Real-time), মাঠ পর্যায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. কঠোর জোনিং (Zoning)
বাজেট বরাদ্দ: ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডস ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান (Action Plan) ২০২১-২০২৬ অনুযায়ী আনুমানিক ১১৯.৮ কোটি টাকা বাজেট প্রয়োজন। ন্যাশনাল মিশন ফর ক্লিন গঙ্গা (National Mission for Clean Ganga) এবং ন্যাশনাল প্ল্যান ফর কনজার্ভেশন অফ অ্যাকুয়াটিক ইকোসিস্টেমস (National Plan for Conservation of Aquatic Ecosystems) থেকে এই অর্থ আদায় করতে হবে।
স্বচ্ছ মানচিত্র ও পুনঃসীমানা নির্ধারণ: অবিলম্বে স্বতন্ত্র, তৃতীয় পক্ষের অডিটে (Audit) ইকেডব্লিউ মানচিত্র সংশোধন করতে হবে। নাজিরাবাদের মতো অননুমোদিত বাদ দেওয়া অঞ্চল পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সম্পূর্ণ সীমানায় স্থায়ী, নজরদারি-সক্ষম জিও-ট্যাগড পিলার বসাতে হবে।
ভাঙন আদেশ কার্যকর: ইকেডব্লিউএমএ-কে রাজ্য পুলিশের সহায়তায় শত শত পেন্ডিং (Pending) ভাঙন আদেশ কার্যকর করতে হবে। পলিউটার পেজ নীতিতে দায়ী ব্যক্তি ও সংস্থার কাছ থেকে কঠোর আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায় করে সেই অর্থ দিয়ে ধ্বংসাবশেষ অপসারণ ও জমি পুনরুদ্ধার করতে হবে।
জীবনরেখা খাল পুনরুদ্ধার: বিশাল, রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক ফিডার খালের ড্রেজিং (Dredging) অপারেশন (Operation) চালাতে হবে। জৈব পৌর বর্জ্য জলের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা হলো অ্যাকুয়াকালচার ব্যবস্থা আর জলাভূমির আর্থ-সামাজিক ভিত্তি টিকিয়ে রাখার অবিসংবাদিত পূর্বশর্ত।
জলাভূমি ডুবলে ডুববে কলকাতা
পূর্ব কলকাতা জলাভূমি আজ অপরিবর্তনীয় ধ্বংসের একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে। এই ১২,৫০০ হেক্টরের পরিবেশগত ইঞ্জিনের (Engine) চলমান ধ্বংস কোনো প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা নয়। এটি একটি করুণ, সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য পরিণতি — যেখানে মিলেমিশে গেছে উন্মত্ত নয়া-উদারবাদী নগর বিস্তার, পদ্ধতিগত শাসন ব্যর্থতা, আর ঐতিহ্যবাহী সম্প্রদায়গুলোর ইচ্ছাকৃত প্রান্তিকীকরণ।
যদি এই ধ্বংস চলতে থাকে, তাহলে শুধু মাছ মরবে না, শুধু সবজির জমি হারাবে না — গোটা মহানগর বন্যায় ডুববে, বাতাস বিষিয়ে যাবে, মানুষের শরীরে জমতে থাকা সীসা আর ক্যাডমিয়াম একদিন বিকলাঙ্গ করবে একটি প্রজন্মকে।
আইন আছে, আদালত আছে, বিজ্ঞান আছে, এমনকি সমাধানও আছে। যা নেই, তা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং যাঁরা এই জলাভূমিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে — সেই মাছচাষিদের প্রতি ন্যূনতম সম্মান।
নাজিরাবাদের সেই আগুনে পঁচিশটি প্রাণ গেছে। কিন্তু এই জলাভূমি মরলে একদিন একটি পুরো শহর ডুববে — কোনো আগুন ছাড়াই, নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে।
প্রশ্ন হলো — আমরা কি সেটা হতে দেব?
তথ্যসূত্র: এই প্রতিবেদন তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপত্র, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চের (ICAR) তথ্য, ইস্ট কলকাতা ওয়েটল্যান্ডস ম্যানেজমেন্ট অথরিটির (EKWMA) আধিকারিক নথি, ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালের (NGT) আদেশনামা এবং একাধিক সমবায়ের সরেজমিন সাক্ষাৎকার।
