পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর দামামা বেজে গিয়েছে। গত ১৫ মার্চ জাতীয় নির্বাচন কমিশন (Election Commission) নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক পারদ চড়তে শুরু করেছে। নির্ঘণ্ট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যে কার্যকর হয়েছে আদর্শ নির্বাচনী আচরণবিধি বা মডেল কোড অফ কন্ডাক্ট (Model Code of Conduct)। আর এবার এই বিধি ভঙ্গের অভিযোগে একে অপরের বিরুদ্ধে কমিশনে কড়া চিঠি জমা দিল রাজ্যের দুই যুযুধান শিবির, তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) এবং ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party)। নিউস্কোপ বাংলার (Newscope Bangla) হাতে আসা এক্সক্লুসিভ নথি অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)- দুজনের বিরুদ্ধেই মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (Chief Electoral Officer) দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
বিজেপির নিশানায় তৃণমূল নেত্রী
গত ২৫ মার্চ, ২০২৬ তারিখে নির্বাচন কমিশনের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে রাজ্য বিজেপি। তাদের অভিযোগের মূল তির রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা শাসক দলের দিকে। চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, শাসক দল হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। আদর্শ নির্বাচনী আচরণবিধির সপ্তম খণ্ড এবং নবম অধ্যায়ের ৯.৩ ও ৯.৪ ধারা অনুযায়ী, নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পর সরকারি খরচে বা সরকারি জায়গায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ছবি বা হোর্ডিং লাগানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বিজেপির অভিযোগ, এই নির্দেশিকাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সরাসরি নির্বাচনী বিধি ভঙ্গের সামিল। চিঠিতে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় থাকা দল যাতে সরকারি পদের অপব্যবহার করে নির্বাচনের প্রচারে কোনও বাড়তি সুবিধা না পায়, তা নিশ্চিত করা উচিত। বিজেপি এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
তৃণমূলের নিশানায় নন্দীগ্রামের বিজেপি প্রার্থী
অন্যদিকে, শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। তারা গত ২৩ মার্চ বিরোধী দলনেতা এবং নন্দীগ্রামের (Nandigram) বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে একটি কড়া অভিযোগ পত্র জমা দিয়েছে, যা কমিশনে গৃহীত হয়েছে ২৪ তারিখ। তৃণমূলের অভিযোগ, গত ২২ মার্চ পূর্ব মেদিনীপুর (Purba Medinipur) জেলার নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বয়াল-২ (Boyal-II) গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় একটি র্যালি করছিলেন বিজেপি প্রার্থী।
শাসক দলের অভিযোগপত্রে জানানো হয়েছে, সেই র্যালিটি যখন তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র করের (Pabitra Kar) বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন সেখানে উপস্থিত বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা এবং তাদের নেতারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্ররোচনামূলক স্লোগান দিতে শুরু করেন। তৃণমূল প্রার্থীকে প্রকাশ্যে ‘চোর’ (Chor) বলে কটাক্ষ করা হয়। তৃণমূল কংগ্রেস তাদের চিঠিতে জানিয়েছে যে, এই ধরনের আচরণ শুধুমাত্র নির্বাচনী বিধি ভঙ্গই নয়, বরং এটি ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বা বিএনএস ২০২৩ (BNS 2023)-এর একাধিক ধারা এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১ (Representation of the People Act, 1951)-এর ১২৩(৪) ধারা অনুযায়ী দুর্নীতিগ্রস্ত আচরণের আওতাভুক্ত। শাসক দলের দাবি, এই ধরনের আক্রমণাত্মক স্লোগান এবং উসকানিমূলক মন্তব্য এলাকার শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করার একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্ত।
কলকাতা থেকে জেলা— তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা
এই জোড়া অভিযোগের জেরে কলকাতা (Kolkata) থেকে শুরু করে জেলাস্তরে, সর্বত্র রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নন্দীগ্রামের মতো হাই-প্রোফাইল কেন্দ্রে দুই প্রার্থীর মধ্যে এই আইনি এবং রাজনৈতিক লড়াই যে আগামী দিনে আরও তীব্র আকার ধারণ করবে, তা এই ঘটনা থেকেই পরিষ্কার।
রাজ্যের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন ঘোষণার প্রথম সপ্তাহেই যেভাবে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পাহাড় জমতে শুরু করেছে, তাতে আগামী দিনগুলোতে নির্বাচন কমিশনকে কার্যত হিমশিম খেতে হতে পারে। একদিকে শাসক দলের বিরুদ্ধে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ, অন্যদিকে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং উসকানিমূলক আচরণের অভিযোগ— এই দুইয়ের মাঝে পড়ে নির্বাচন কমিশন কীভাবে নিরপেক্ষভাবে গোটা পরিস্থিতি সামাল দেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Recent Comments