ভারতের (India) নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) সংঘাত এবার এক নতুন মোড় নিল। রাজ্যের ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক এবার সরাসরি সংসদীয় রাজনীতির আঙিনায় আছড়ে পড়তে চলেছে। জানা গিয়েছে, দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের (Gyanesh Kumar) বিরুদ্ধে সংসদে ইমপিচমেন্ট বা পদচ্যুতি প্রস্তাব আনার জোরদার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে ঘাসফুল শিবির। আর সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, আগামী সপ্তাহেই দু’দিনের জন্য কলকাতা (Kolkata) সফরে আসার কথা রয়েছে খোদ মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের। তাঁর এই বঙ্গ সফরের ঠিক প্রাক্কালেই এমন মেগা পরিকল্পনার খবর জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
কী কারণে এই চরম সংঘাত?
সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের একাধিক জায়গা থেকে অভিযোগ উঠছিল যে, বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বহু বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগ তুলে সম্প্রতি দিল্লি (Delhi) সফরে গিয়ে নির্বাচন সদনে খোদ জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। কিন্তু বৈঠক চলাকালীন তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং বৈঠক বয়কট করে বেরিয়ে আসেন। মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট অভিযোগ ছিল, তাঁকে সেখানে অপমান করা হয়েছে এবং কমিশন সম্পূর্ণরূপে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির (BJP) শাখা সংগঠন হিসেবে কাজ করছে। এরপর সাংবাদিক বৈঠক করে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, মানুষের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনা হলে তাঁর দল তাতে পূর্ণ সমর্থন জানাবে।
কীভাবে এগোচ্ছে ঘাসফুল শিবির?
মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদটি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ। নিয়ম অনুযায়ী, এই পদের অধিকারীর বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনতে গেলে সংসদের দুই কক্ষ মিলিয়ে অন্তত ১০০ জন সাংসদের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। বর্তমানে লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে তৃণমূলের মোট সাংসদ সংখ্যা ৪১ জন। ফলে, প্রয়োজনীয় ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে অন্যান্য বিরোধী দলগুলির সমর্থন অপরিহার্য। দলীয় সূত্রে খবর, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) ইতিমধ্যেই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সাংসদদের নির্দেশ দিয়েছেন সমমনোভাবাপন্ন বিরোধী দলগুলির সঙ্গে অতি দ্রুত যোগাযোগ করতে।
ইন্ডিয়া জোটের শরিকদের ভূমিকা
সূত্রের খবর, ইমপিচমেন্টের এই প্রস্তাবে সই জোগাড় করতে তৃণমূল মূলত বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটের অন্যান্য শরিকদের দ্বারস্থ হয়েছে। অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টির (Samajwadi Party) মতো বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক দল এই ইস্যুতে তৃণমূলের পাশে দাঁড়াতে সম্মত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে জাতীয় কংগ্রেসের (Congress) দিক থেকে এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত সবুজ সংকেত মেলেনি। তা সত্ত্বেও, তৃণমূলের অন্দরমহলের দাবি, কংগ্রেসকে ছাড়াই তারা ইতিমধ্যে ১০০ জনের বেশি সাংসদের সমর্থন জোগাড় করে ফেলেছে।
রাজনৈতিক কৌশল ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল নেতৃত্ব খুব ভালো করেই জানে যে, বর্তমান সংসদে শাসক শিবিরের যা সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তাতে এই ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব ভোটাভুটিতে কোনওভাবেই পাশ করানো সম্ভব নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা এই কঠিন পথে হাঁটছে, কারণ এর পিছনে রয়েছে এক সুগভীর রাজনৈতিক কৌশল। এই প্রস্তাবটি একবার সংসদে পেশ হলে তা চিরতরে নথিবদ্ধ বা ‘রেকর্ড’ হয়ে থাকবে। সাধারণ মানুষের কাছে তৃণমূল এই বার্তাই পৌঁছে দিতে চাইছে যে, বাংলার মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে প্রস্তুত। এছাড়া, যে সমস্ত বিরোধী দল এই প্রস্তাবে সই করতে অস্বীকার করবে, তাদের বিজেপি-বিরোধিতার সদিচ্ছা নিয়েও আগামী দিনে ময়দানে প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাবে ঘাসফুল শিবির।
আগামী সপ্তাহে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার যখন রাজ্যে পা রাখবেন, তখন এই রাজনৈতিক উত্তাপ যে আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে, তা বলাই বাহুল্য। রাজ্যের আসন্ন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা নিয়ে এই সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দড়ি টানাটানি আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিকে ঠিক কোন পথে চালিত করে, এখন সেদিকেই নজর গোটা দেশের।
