পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) রাজনীতিতে এখন চরম উত্তেজনা এবং রদবদলের হাওয়া। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের দামামা ইতিমধ্যেই বেজে গিয়েছে রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে। আর এই ডামাডোলের মাঝেই এক বিশাল রাজনৈতিক চমকের ইঙ্গিত দিলেন রাজ্যের বিদায়ী ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি (Manoj Tiwari)। ঘাসফুল শিবিরের টিকিট না পেয়ে তিনি যে কতটা হতাশ এবং ক্ষুব্ধ, তা আর একেবারেই গোপন রাখলেন না। বরং সরাসরি জানিয়ে দিলেন যে, বিরোধী দলগুলির থেকে, বিশেষ করে বিজেপি (BJP) থেকে তাঁর কাছে ইতিমধ্যেই যোগদানের প্রস্তাব এসেছে।
একুশের বিধানসভা নির্বাচনে যখন তিনি প্রথমবার রাজনীতির ময়দানে পা রাখেন, তখনকার পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেছিল। সেই সময়ের স্মৃতি রোমন্থন করে মনোজ আক্ষেপের সুরে জানান, “২০২১ সালে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) আমাকে ১৮ বার ফোন করেছিলেন। আমি তখন ক্রিকেট প্র্যাকটিস করছিলাম বলে ফোন ধরতে পারিনি। পরে যখন যোগাযোগ হয়, তখন আমাকে হাওড়া (Howrah) জেলার শিবপুর (Shibpur) কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করা হয়।”
সেই নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে বিরোধী দলের হেভিওয়েট নেতা রথীন চক্রবর্তীকে বেশ বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন বাংলার প্রাক্তন এই ক্রিকেট অধিনায়ক। মানুষের বিপুল সমর্থন পেয়ে বিধায়ক হওয়ার পর তাঁকে পুরস্কৃত করে ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ দফতরের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছর পর, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সেই শিবপুর কেন্দ্রেই তাঁকে সম্পূর্ণ ব্রাত্য করা হয়েছে। তাঁর বদলে এবার ঘাসফুল শিবিরের প্রার্থী হয়েছেন রানা চট্টোপাধ্যায়।
টিকিট না পাওয়ার এই অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তে যে তাঁর প্রবল অভিমান হয়েছে, তা স্পষ্ট করে দিয়ে মনোজ বলেন, “খারাপ তো বটেই লেগেছে, কারণ দিনশেষে আমরা সবাই মানুষ। আমাদেরও আবেগ অনুভূতি রয়েছে।” শুধু আক্ষেপ প্রকাশ করেই তিনি থেমে থাকেননি, রীতিমতো জল্পনা উসকে দিয়েছেন দলবদলের বা ফুলবদলের। তাঁর স্পষ্ট কথা, “আমার কাছে অন্য দলের তরফ থেকে প্রস্তাব আছে। বিজেপি আমাকে সরাসরি প্রস্তাব দিয়েছে। আমি এখন পুরো বিষয়টা নিয়ে গভীরভাবে ভাবনাচিন্তা করছি।”
তাঁর এই বিস্ফোরক মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভারত (India) জুড়ে যখন নির্বাচন আসে, তখন দলবদলের খেলা এক অতি পরিচিত চিত্র হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু একজন বিদায়ী মন্ত্রীর প্রকাশ্যে এমন মন্তব্য শাসকদলের অন্দরে নিঃসন্দেহে অস্বস্তির মেঘ তৈরি করেছে। শিবপুরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে মনোজ যদি সত্যিই পদ্মশিবিরে যোগ দেন, তবে তা শাসক দলের জন্য বড়সড় চ্যালেঞ্জের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর একটা আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল।
তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, এই কোপে শুধু মনোজ একা পড়েননি। এবার ঘাসফুলের টিকিট পাননি রাজ্যের আরও তিন বিদায়ী মন্ত্রী—তাজমুল হোসেন, বিপ্লব রায়চৌধুরী এবং জ্যোৎস্না মান্ডি। সব মিলিয়ে প্রায় ৭৪ জন বর্তমান বিধায়ককে এবার ছেঁটে ফেলেছে শাসকদল, যা রাজ্যের রাজনীতিতে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। দলের এই পদক্ষেপকে অনেকেই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া কমানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন। বাদ পড়েছেন বেলেঘাটার দাপুটে নেতা পরেশ পাল কিংবা জোড়াসাঁকোর বিবেক গুপ্তর মতো পরিচিত মুখেরা। আবার বারাসত কেন্দ্রে তারকা বিধায়ক চিরঞ্জিতের পরিবর্তে টিকিট দেওয়া হয়েছে সব্যসাচী দত্তকে।


Recent Comments